ঢাকাThursday , 10 September 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালকে ফলজ-বনজ বৃক্ষের সবুজ বেষ্টনীতে গড়ার উদ্যোগ ৫০ হাজার চারা বিতরণের কর্মসূচির উদ্বোধন

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৫৫

আহমেদ বায়েজিদ :: পরিকল্পনাহীনভাবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও অনুপযোগী গাছ লাগানোর প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে বরিশালকে ফলজ ও বনজ বৃক্ষের সবুজ বেষ্টনীতে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছে বিভাগীয় প্রশাসন। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ বলেছেন, অতীতে পরিবেশের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনির মতো গাছ লাগানো হয়েছে। এসব গাছ পরিবেশের জন্য কতটা উপযোগী, তা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এমনকি এসব গাছে পাখি পর্যন্ত বসে না। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলজ ও বনজ বৃক্ষের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বৃহস্পতিবার দুপুরে বরিশাল সদর উপজেলার কড়াপুর ইউনিয়নের কড়াপুর পপুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত ৫০ হাজার চারা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, গাছ শুধু পরিবেশ রক্ষার উপকরণ নয়; এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। একটি পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা, ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মানুষের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘সবুজের মাধ্যমে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের এ কর্মসূচি বরিশাল বিভাগেও গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে। শুধু সরকারি উদ্যোগে নয়, প্রতিটি পরিবার, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে এ কার্যক্রমের অংশীদার হতে হবে। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যার দিকে তাকালে হবে না। কোন জায়গায় কোন প্রজাতির গাছ ভালো জন্মাবে, কোন গাছ পরিবেশের জন্য উপকারী এবং কোন গাছ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপকারে আসবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে চারা রোপণ করতে হবে। তার মতে, এমন গাছ নির্বাচন করতে হবে যেগুলো স্থানীয় পরিবেশ ও মাটির সঙ্গে খাপ খায় এবং একই সঙ্গে মানুষ ও প্রাণিকুলের উপকারে আসে। বিশেষ করে ফলজ গাছের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, আমড়া, নারকেল, পেয়ারা, নিমসহ বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছ বেশি করে লাগানো হলে পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাড়ির আঙিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তার পাশে, সরকারি জায়গা ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থানে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই বরিশালের চেহারায় পরিবর্তন আনা সম্ভব। দেশে ফলের উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে মো. খলিল আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে এমন অনেক ফলজ গাছ রয়েছে যেগুলো সহজেই উৎপাদন করা সম্ভব। নারকেল, আমড়া, পেয়ারা ও অন্যান্য স্থানীয় ফলের গাছ ব্যাপকভাবে রোপণ করা গেলে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারে দেশীয় ফলের সরবরাহ বাড়বে। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ফল আমদানি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। দেশে ফলের উৎপাদন বাড়াতে পারলে আমদানির ওপর চাপ কমবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক ও ফলচাষিরাও লাভবান হবেন। বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, একটি ফলজ গাছ শুধু একটি পরিবারকে ফল দেয় না; এর সঙ্গে কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও বাজার ব্যবস্থার অনেক মানুষ অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত থাকেন। তাই ফলজ বৃক্ষরোপণকে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবেও দেখতে হবে। চারা বিতরণ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। শুধু একটি চারা হাতে তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হবে না। শিক্ষার্থীদের নিজেদের লাগানো গাছের পরিচর্যা করতে হবে, নিয়মিত পানি দিতে হবে এবং গাছটি যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, একটি গাছ বড় হতে সময় লাগে। তাই চারা রোপণের পর সেটিকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। একটি গাছ যদি বড় হয়ে ওঠে, সেটি ভবিষ্যতে ছায়া, ফল, কাঠ, অক্সিজেনসহ নানা উপকার দেবে। একই সঙ্গে পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থলও তৈরি হবে। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলকে সবুজ বেষ্টনীর আওতায় আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বিভাগীয় কমিশনার। তিনি বলেন, একটি জায়গায় কয়েকটি গাছ লাগিয়ে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিভাগের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শহর পর্যন্ত যেখানে উপযুক্ত জায়গা রয়েছে, সেখানেই পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়কের পাশ, বাড়ির আঙিনা এবং খালি জায়গাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। তিনি আরও বলেন, বরিশালের প্রকৃতি ও পরিবেশকে বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ গাছ লাগানো হবে। ধীরে ধীরে এসব গাছ বেড়ে উঠলে বরিশাল একটি সবুজ বেষ্টনীর মধ্যে চলে আসবে। এতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুর মান উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করবে। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, “আমরা এমন একটি বরিশাল চাই, যেখানে রাস্তার পাশে গাছ থাকবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গাছ থাকবে, মানুষের বাড়ির আঙিনায় ফলজ গাছ থাকবে। বরিশালের প্রতিটি এলাকায় সবুজের উপস্থিতি দৃশ্যমান করতে হবে।” তিনি সবাইকে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়। সমাজের প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। অনুষ্ঠানে বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকারের সভাপতিত্বে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদা সুলতানা এবং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. নুরুল আমীন। আলোচনা শেষে অতিথিরা শিক্ষার্থীদের হাতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা তুলে দিয়ে ৫০ হাজার চারা বিতরণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার বিষয়ে উৎসাহ সৃষ্টি করা হয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এদিকে একই দিন বিকেল সাড়ে ৪টায় নগরীর রাজাবাহাদুর সড়কে সংলগ্ন বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবনে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা বিতরণ করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) থেকে ১,০০০টি নারিকেল চারা সংগ্রহ করে ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করেছেন। বৃহস্পতিবার ঝালকাঠির রাজাপুর, ঝালকাঠি সদর, কাঠালিয়া ও নলছিটি উপজেলায় ১০০টি করে মোট ৪০০টি এবং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলায় ৬০০টি নারিকেল চারা বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া ২০০টি আমড়া চারাও বিতরণ করা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে বিভাগের সব জেলায় এসব চারা বিতরণ করা হবে। বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে চারা বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে বরিশালের পরিবেশ সুরক্ষায় একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় উপযোগী ফলজ ও বনজ বৃক্ষের সংখ্যা বাড়ানো গেলে আগামী কয়েক বছরে বরিশালের সবুজ আচ্ছাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, শুধু চারা বিতরণ নয়—রোপণের পর গাছগুলো কতটা টিকে থাকছে এবং পরিচর্যা হচ্ছে কি না, তারও নিয়মিত তদারকি করা হবে। কারণ একটি চারা বিতরণের চেয়ে সেটিকে বড় করে তোলাই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মূল সাফল্য। বিভাগীয় প্রশাসনের লক্ষ্য অনুযায়ী জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি বরিশালের মানুষ ফলজ বৃক্ষের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।