
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে আট বছরেও শেষ হয়নি কাজ : ডিসেম্বরে চালুর আশ্বাস নেহালগঞ্জ সেতুতে এখনো বসেনি ২ স্প্যান।
আড়িয়াল খাঁ নদীর ওপর বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার নেহালগঞ্জ সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল প্রায় আট বছর আগে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেতুর মূল অবকাঠামোর বড় অংশ দৃশ্যমান হলেও এখনো বসানো হয়নি প্রয়োজনীয় সেই দুটি স্প্যান। পাশাপাশি দুই প্রান্তের সংযোগ সড়কের কাজও চলছে। ফলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করার সড়ক বিভাগের আশ্বাস বাস্তবে কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত শুক্রবার নেহালগঞ্জ সেতু এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর দুই প্রান্তে সংযোগ সড়কের কাজ চলছে। মূল সেতুর পিয়ারগুলোর অধিকাংশ দৃশ্যমান। তবে দুটি স্প্যান বসানোর কাজ এখনো বাকি। এসব স্প্যান নিয়ে মাঠপর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও চোখে পড়েনি। ফলে সেতুর দুই প্রান্তের সড়ক প্রস্তুত হলেও পুরো সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়নি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ অবশ্য ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুটি চালুর বিষয়ে আশাবাদী। এর আগে বরিশাল সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং জমির মালিকদের অর্থ বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তার আশা, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুটি হস্তান্তর করে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হলে এখন বাকি থাকা স্প্যান, সেতুর আনুষঙ্গিক কাজ এবং সংযোগ সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। এর মধ্যে কোনো একটি কাজেও আবার বিলম্ব হলে ডিসেম্বরের লক্ষ্যও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নেহালগঞ্জ সেতুর এই দীর্ঘসূত্রতার শুরু অবশ্য নির্মাণকাজের মাঝপথ থেকেই। সরকারি অর্থায়নে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০১৭ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরে নকশা, নদীতে নৌযান চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চতা এবং জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। এসব কারণে একপর্যায়ে প্রায় নয় মাস কাজ বন্ধ ছিল। পরে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৯২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
নেহালগঞ্জ ও গোমা-আড়িয়াল খাঁ নদীর ওপর একই সময়ে নেওয়া দুটি সেতু প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বরিশাল অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আনা। প্রায় ৮০০ মিটার দৈর্ঘ্যের দুই সেতুর নির্মাণ ব্যয়ও প্রায় ১০০ কোটি টাকা করে ধরা হয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে শুরু হওয়া গোমা সেতুর কাজ শেষ হয়ে যান চলাচল শুরু হলেও নেহালগঞ্জ সেতু এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।
নেহালগঞ্জ সেতুর দীর্ঘ বিলম্বের পেছনে নদীর নাব্যতা ও নৌযান চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেতু নির্মাণের নকশা নিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আপত্তি ওঠার পর নদীর মাঝের অংশের উচ্চতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এতে আগের নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়। পরবর্তী সময়ে সেতুর নির্দিষ্ট অংশের জন্য নতুন করে স্টিলের স্প্যান নির্মাণ ও স্থাপনের কাজ দেওয়া হয়। এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মেসার্স কনক্রিট স্টিল অ্যান্ড টেকনোলজি’। চীন থেকে স্টিলের স্প্যান আমদানিতে বিলম্বও নির্মাণকাজকে আরও ধীর করে দেয় বলে জানা যায়। প্রকল্পটির মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে ‘এম মাহফুজ খান লিমিটেড’। সেতুর বিভিন্ন অংশের কাজ বাস্তবায়নে পৃথক প্রতিষ্ঠানও যুক্ত হয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটির কাজ এগোলেও নকশা পরিবর্তন, স্প্যানের জটিলতা, ভূমি অধিগ্রহণ এবং নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ, সব মিলিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নেহালগঞ্জ সেতুর ১৩টি স্প্যানের মধ্যে ১২টির পিয়ারের কাজ প্রায় শেষ হলেও জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং স্প্যান-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে কাজ আটকে ছিল। তখনও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেতু শেষ করা কঠিন বলে জানিয়েছিলেন সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
এরপরও প্রকল্পটি এগিয়েছে। বর্তমানে সেতুর মূল কাঠামোর অধিকাংশ দৃশ্যমান। কিন্তু দুটি স্প্যান বসানো এখনো বাকি থাকা এবং সংযোগ সড়কের কাজ চলমান থাকায় পুরো প্রকল্প শেষ হওয়ার চূড়ান্ত চিত্র এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।
:
বিশেষ করে বরিশাল সদর উপজেলার পতাং অংশের সংযোগ সড়ক নিয়ে জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কথা আগেও জানিয়েছিল সড়ক বিভাগ। অন্যদিকে চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের দিকের সংযোগ সড়কের কাজ তুলনামূলকভাবে এগিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সরেজমিনে চন্দ্রমোহন এর নেহালগঞ্জ অংশে সংযোগ সড়কের মাটি ভরাট ও রোলিং শেষ হতে দেখা গেছে। এখন শুধু পিচ ঢালাই বাকী। ফলে নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পাশাপাশি দুই প্রান্তের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ করাও এখন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে নেহালগঞ্জ সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, দীর্ঘদিনের যোগাযোগ-দুর্ভোগ থেকে মুক্তির প্রত্যাশা। সেতুটি চালু হলে বরিশাল থেকে বাউফল, ভোলা, লক্ষ্মীপুর ও দুমকিসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার কথা। পণ্য পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত, সব ক্ষেত্রেই সময় ও ব্যয় কমবে বলে আশা স্থানীয়দের।
কিন্তু বছরের পর বছর নির্মাণকাজ চলতে থাকায় সেই প্রত্যাশা এখন অনেকটাই অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে। একই নদীর ওপর একই সময়ে নেওয়া দুটি সেতুর একটির কাজ শেষ হয়ে যান চলাচল শুরু হলেও অন্যটির কাজ এখনো শেষ না হওয়া স্থানীয়দের হতাশা আরও বাড়িয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন- আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নেহালগঞ্জ সেতু সত্যিই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া যাবে কি না। সড়ক বিভাগের আশ্বাস বাস্তবায়িত করতে হলে বাকি স্প্যান দ্রুত স্থাপন, সংযোগ সড়কের অসমাপ্ত কাজ শেষ, প্রয়োজনীয় ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতার নিষ্পত্তি এবং সেতুর নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
আট বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা মানুষের কাছে ডিসেম্বর এখন আর কেবল একটি সময়সীমা নয়; এটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের একটি প্রতিশ্রুতি। মাঠের কাজের গতি শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

