
নিজস্ব প্রতিবেদক :: রাত গভীর। চারপাশে নীরবতা। নগরীর অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমিয়ে, তখন হঠাৎ গর্জে ওঠে ড্রেজারের ইঞ্জিন। কয়েক কিলোমিটার দূরে নদীতে নোঙর করা বাল্কহেড থেকে মোটা পাইপের মাধ্যমে বালু ছুটে আসে নগরের ভেতরে। কোথাও সেই বালু দিয়ে তৈরি হচ্ছে পুকুরের ওপর বাঁধ, কোথাও নিচু জমি ভরাট হচ্ছে। আবার কোথাও একসময়কার জলাশয়ের অস্তিত্বও মুছে গেছে।
এক রাত নয়, দুই রাত নয়—রাতের পর রাত এভাবেই চলছে বালু ফেলার কাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের আলোয় যেখানে পুকুর দেখা যায়, রাত পেরোলেই সেখানে বাড়তে থাকে বালুর স্তর। কয়েক দিন পর ঘাস গজিয়ে গেলে দূর থেকে বোঝার উপায়ও থাকে না—এই জায়গাটিতেই কিছুদিন আগেও ছিল জলাশয়।
বরিশাল নগরীর কাউনিয়া, রূপাতলীসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে এখন চোখে পড়ছে ড্রেজারের পাইপের জাল। কোথাও রাস্তার পাশ দিয়ে, কোথাও ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে, আবার কোথাও বসতবাড়ির গা ঘেঁষে চলে গেছে এসব পাইপ। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রাত হলেই এসব পাইপের মাধ্যমে পুকুর ও নিচু জমিতে বালু ফেলা হয়।
কাউনিয়া থেকে রূপাতলী—পাইপের জাল
সরেজমিনে পুরানপাড়া, হাউজিং, টেক্সটাইল মোড়, রোকেয়া আজিম সড়ক, তোফাজ্জেল হোসেন সড়ক, ময়লা খোলা, কাউনিয়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মনসা গলি, কাউনিয়া প্রথম গলি, বিসিক এলাকা এবং রূপাতলীর বেশ কয়েকটি এলাকায় ড্রেজারের পাইপের সংযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পাইপের বড় অংশ কীর্তনখোলা ও তালতলী নদীতে নোঙর করা বাল্কহেডের সঙ্গে যুক্ত।
পুরানপাড়া এলাকার বাসিন্দা ওয়াহাব সিকদার জানান, প্রায় সাত-আট মাস আগে ২০ থেকে ২৫ জন লোক তার জমির ওপর দিয়ে ড্রেজারের পাইপ বসান। তিনি বাধা দিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, বাধা দেওয়ার পর তাকে হুমকিও দেওয়া হয়।
ওয়াহাব সিকদারের ভাষায়, “আমি তাদের কাউকেই চিনি না।”
রোকেয়া আজিম সড়কের বাসিন্দা লাবলু হাওলাদার বলেন, প্রায় ছয় মাস আগে ওই এলাকায় ড্রেজারের পাইপ ঢোকে। তার দাবি, আশপাশের সাত-আটটি পুকুর ভরাট করা হয়েছে। এখন ওই জায়গাগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই যে সেখানে একসময় পুকুর ছিল।
কাউনিয়া হাউজিং এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান কামালের দাবি, ৫ আগস্টের পর তার এলাকায় অন্তত ৫০টির বেশি ছোট-বড় পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়েছে। এ কাজে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
৩০ ওয়ার্ডেই ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ
বরিশাল সিটি করপোরেশনের দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঈদের ছুটিতে কাউনিয়ার মনসা গলি এলাকায় একটি বড় পুকুর ভরাটের মাধ্যমে বিষয়টি দৃশ্যমানভাবে শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বলে তাদের দাবি।
তাদের ভাষ্য, নদীতে নোঙর করা বাল্কহেড থেকে পাইপের মাধ্যমে বালু এনে নগরের বিভিন্ন নিচু জমি ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সাবেক এক প্রশাসকের সময় সুবিধা নিয়ে অঘোষিতভাবে পুকুর ও জলাশয় ভরাটের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে ড্রেজারের পাইপের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
‘ম্যানেজ’ করেই চলে বালু ফেলার কাজ—ড্রেজার মালিকের দাবি
এক ড্রেজার মালিকও পরিচয় গোপন রাখার শর্তে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। তার দাবি, নদী থেকে বালু উত্তোলন থেকে শুরু করে ভরাটকৃত স্থানে বালু পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষকে অর্থ দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করতে হয়।
তার অভিযোগ, কাউকে এককালীন এবং কাউকে মাসিক ভিত্তিতে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে তিনি কার কার কাছে বা কীভাবে অর্থ দেওয়া হয়, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট কোনো নাম বা নথি দেননি।
অভিযান হলেও থামছে না—স্থানীয়দের অভিযোগ
সম্প্রতি কোস্টগার্ড কয়েকটি ড্রেজার ও বাল্কহেড আটক করে জরিমানা করেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এতে দীর্ঘমেয়াদে পুকুর ভরাটের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
তাদের দাবি, অভিযান শেষ হওয়ার পর আবার রাতের আঁধারে ড্রেজার চালু হয়ে যায়।
বরিশাল নগরীর জলাশয় ভরাটের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালেও কীর্তনখোলা নদীর তীরঘেঁষা নগরের একটি এলাকায় ড্রেজার দিয়ে পুকুর ভরাটের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছিল এবং সিটি করপোরেশন তা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
২০২৬ সালেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাশয় ভরাট নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জুলাইয়ে আমিরকুটির এলাকায় একটি পুরোনো পুকুর ভরাটের ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর বালি অপসারণের নির্দেশ দেয়। আগস্টে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ের কাছাকাছি একটি পুকুর ভরাট নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
হারিয়ে যাচ্ছে নগরের জলাধার
স্থানীয় পরিবেশবিদদের দাবি, গত কয়েক দশকে বরিশাল নগরীর বিপুলসংখ্যক পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। তাদের ধারণা, আশির দশক বা তার আগে নগরীতে হাজারের বেশি ছোট-বড় পুকুর ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।
সরকারি ৩০টি পুকুরের বাইরে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে এখনো কয়েকশ ব্যক্তিমালিকানাধীন বা পারিবারিক পুকুর টিকে আছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ না থাকায় নগরীতে বর্তমানে মোট কতটি পুকুর রয়েছে, তার নির্ভুল সরকারি হিসাব পাওয়া কঠিন।
পরিবেশবাদীদের ধারণা, দৃশ্যমান ও ব্যবহারযোগ্য পুকুরের সংখ্যা বর্তমানে ৩০০ থেকে ৪০০টির মধ্যে হতে পারে। তবে এ সংখ্যা স্বাধীন জরিপের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
জলাবদ্ধতা ও অগ্নিঝুঁকির আশঙ্কা
সুজনের বরিশাল জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, বরিশালজুড়ে প্রতিদিন একের পর এক জলাশয় ও পুকুর নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। এভাবে জলাশয় ভরাট হতে থাকলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।
তার মতে, পুকুর ও জলাশয় শুধু পানি ধারণের জায়গা নয়; নগরের অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এগুলোর ভূমিকা রয়েছে। আগুন লাগলে নিকটবর্তী জলাধার থেকে পানি সংগ্রহের সুযোগ কমে গেলে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আইনেও জলাধার ভরাটে নিষেধাজ্ঞা
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে অনুমতি ছাড়া নিচু ভূমি ভরাট বা প্রাকৃতিক জলাধারের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনে নদী, খাল, বিল, জলাশয়, পুকুর ও ডোবার পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের সংশ্লিষ্ট আইন ওবিধানগুলোতেও জলাধার ও জলাভূমি সুরক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।
বিসিসি: ১৩টি বালু অবতরণ কেন্দ্র বন্ধের উদ্যোগ
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, বরিশাল নগরীতে ১৮টি বালু অবতরণ কেন্দ্র বা আনলোড পয়েন্টের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি পয়েন্ট আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “বাকি ১৩টি বালু অবতরণ কেন্দ্র বন্ধের জন্য চিঠি দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত এসব বন্ধ করা হবে।”
জেলা প্রশাসন: জড়িতদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা
বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন এশিয়া পোস্টকে বলেন, সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্যে বরিশালে একের পর এক জলাশয় ভরাটের খবর উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, যারা জলাশয় ও পুকুর ভরাটের মতো অবৈধ কাজে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই—রাতের ড্রেজার বন্ধ হবে কবে?
বরিশাল নগরের পুকুর ও জলাশয় শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; নগরের পানি নিষ্কাশন, বৃষ্টির পানি ধারণ, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পানির উৎস হিসেবে এগুলোর গুরুত্ব রয়েছে।
তাই রাতের আঁধারে ড্রেজারের পাইপ বসিয়ে জলাশয় ভরাটের অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব জলাশয় আইন লঙ্ঘন করে ভরাট করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নগরবাসীর প্রশ্ন—আজ যে পুকুরটি বালুর নিচে চাপা পড়ছে, আগামীকাল তার জায়গায় তৈরি হবে কী? আর তখন বরিশালের বৃষ্টির পানি যাবে কোথায়?

