
নিজস্ব প্রতিবেদক :: ধ্বংসের মুখে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাণশিল্প, কর্মহীন হাজারো শ্রমিক
একসময় কীর্তনখোলা নদীর তীরজুড়ে বিরাজ করত নৌযান নির্মাণের ব্যস্ততা। বিশাল আকৃতির যাত্রীবাহী লঞ্চ তৈরির মধ্য দিয়ে মুখর থাকত বরিশালের বিভিন্ন শিপইয়ার্ড। সময়ের পরিক্রমায় সেই কর্মচাঞ্চল্য এখন অনেকটাই স্তিমিত। নানা অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নৌপথে যাত্রীসংখ্যা হ্রাসের সম্মিলিত অভিঘাতে অস্তিত্বসংকটে পড়েছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাণশিল্প।
স্থানীয়ভাবে প্রায় পাঁচ দশক ধরে এ শিল্পের অবকাঠামো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। পদ্মা সেতু চালুর পর সড়কপথে যাতায়াতের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নৌপরিবহনে যাত্রীচাপ কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। একই সময়ে ইস্পাতসহ নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদনব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ফলে কয়েকশ কোটি টাকার বিনিয়োগনির্ভর এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
বরিশালে জাহাজ নির্মাণশিল্পের সূচনা হয়েছিল ষাটের দশকে, সুরভী শিপিং লাইন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও লঞ্চ ব্যবসায়ী প্রয়াত গোলাম মাওলার উদ্যোগে। পরবর্তী সময়ে বেলতলা, দপদপিয়াসহ কীর্তনখোলার তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠে একাধিক বৃহৎ শিপইয়ার্ড। সুরভী, সুন্দরবন, নিজাম, এম খান ও কে-কাদেরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের নৌপরিবহন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ঢাকা-বরিশালসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার নৌপথে চলাচলকারী বিলাসবহুল ডাবল ডেকার লঞ্চের উল্লেখযোগ্য অংশ নির্মিত হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে। দেশের বৃহত্তম যাত্রীবাহী লঞ্চ হিসেবে পরিচিত ‘সুন্দরবন-১৬’-এর নির্মাণও এ শিল্পের সক্ষমতার পরিচায়ক।
একসময় বরিশালের শিপইয়ার্ডগুলোতে বছরে ছয়টিরও বেশি নতুন লঞ্চ নির্মাণ করা হতো। প্রতিটি নৌযান তৈরিতে ব্যয় হতো আনুমানিক ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে নতুন লঞ্চ নির্মাণের চাহিদা ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কাঁচামালের ঊর্ধ্বমূল্য ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ‘এম খান-৭’ নদীতে নামার পর বরিশালের শিপইয়ার্ডগুলোতে নতুন নৌযান নির্মাণ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সুরভী শিপইয়ার্ডও পরিত্যক্ত অবস্থায় একপর্যায়ে নদীভাঙনের কবলে বিলীন হয়ে যায়।
বৃহৎ জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৌযান নির্মাণ ও মেরামতনির্ভর ডকইয়ার্ডগুলোও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রয়েছে। নগরীর কেডিসি-সংলগ্ন চাঁদমারী এলাকা এবং সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেই কাজের সংকট প্রকট। কিছু ডকইয়ার্ড সীমিত পরিসরে টিকে থাকলেও সেখানে নিয়মিত কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রায় অনুপস্থিত।
শিল্পটির এই স্থবিরতার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়েছে শ্রমজীবী মানুষের ওপর। সুন্দরবন শিপইয়ার্ডেই একসময় কর্মরত প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা এসব কর্মীর অনেকেই এখন জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছেন। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে তাঁদের কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে দিনমজুরিতে যুক্ত হয়েছেন।
শিপইয়ার্ডের সাবেক শ্রমিক আসাদুজ্জামান জানান, দীর্ঘ সময় লঞ্চ নির্মাণের কাজে নিয়োজিত থাকার পর বর্তমানে তিনি কর্মহীন জীবনযাপন করছেন। তাঁর মতো অসংখ্য শ্রমিকের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তাঁরা চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
একই দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন রফিক নামের আরেক সাবেক শ্রমিক। তিনি জানান, কাজ বন্ধ হওয়ার পর সঞ্চিত অর্থ দিয়ে কয়েক মাস সংসার চালিয়েছিলেন। সেই অর্থ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে একজন রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে দিনমজুরির কাজ করছেন। পেশাগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও আগের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় তাঁকে বিকল্প পেশা বেছে নিতে হয়েছে।
সুন্দরবন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক সোহাগ হাওলাদারের মতে, পদ্মা সেতু চালুর পর নৌপথে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় নতুন লঞ্চ নির্মাণের কার্যাদেশ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্প গ্রহণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের কর্মচ্যুত করা ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে কার্যকর বিকল্প ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, সুরভী শিপইয়ার্ডের পরিচালক রেজিন-উল কবির জানান, একসময়কার বৃহৎ নির্মাণকেন্দ্রটি দীর্ঘ আগেই বন্ধ হয়ে নদীভাঙনের কারণে বিলীন হয়েছে। নতুন নৌযান নির্মাণ বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বরিশালের জাহাজ নির্মাণশিল্পের পুনরুজ্জীবনে নৌপরিবহন খাতে চাহিদা বৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য স্থিতিশীল রাখা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা জরুরি। অন্যথায় দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, বিপুল বিনিয়োগ ও দক্ষ জনশক্তিনির্ভর এ শিল্পের অবশিষ্ট অবকাঠামোও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

