ঢাকাWednesday , 21 October 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে প্রতিদিন গড়ে ৯টি বিবাহবিচ্ছেদ! দায়ী কে স্বামী, স্ত্রী, নাকি ভাঙছে পারিবারিক বন্ধন?

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬৫

মারুফ হোসেন বাবু  :: একসময় যে সংসার গড়ে উঠত আজীবন একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন নিয়ে, সেই সংসারই এখন ভেঙে যাচ্ছে নানা টানাপোড়েনে। ভালোবাসা, বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দাম্পত্য সম্পর্কের জায়গায় ক্রমেই বাড়ছে অবিশ্বাস, মানসিক দূরত্ব, পারিবারিক কলহ ও বিচ্ছেদের প্রবণতা। বরিশাল জেলায় বিবাহবিচ্ছেদের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই উদ্বেগজনক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে বরিশাল জেলায় ১০ হাজার ৭৩৮টি বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়েছে। গড়ে হিসাব করলে প্রতিদিন প্রায় ১০টি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় নয়টি তালাকের আবেদন জমা পড়ছে। আবেদন ও নিবন্ধিত বিচ্ছেদ এক বিষয় নয়; তবে উভয় তথ্যই দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রশ্ন উঠছে—কেন ভাঙছে এত সংসার? দায় কি শুধু স্বামীর, নাকি স্ত্রীরও রয়েছে? নাকি পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক নির্যাতন, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বহীনতা সম্মিলিতভাবে ঠেলে দিচ্ছে বিচ্ছেদের দিকে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। কেউ দায়ী করছেন স্বামীকে, কেউ স্ত্রীকে। আবার অনেকের মতে, বিবাহবিচ্ছেদের মতো জটিল বিষয়ে একতরফাভাবে কাউকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রতিটি সম্পর্কের ভাঙনের পেছনে থাকে আলাদা প্রেক্ষাপট, অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা। তবে বরিশালের পরিসংখ্যান বলছে, বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন কিছু পারিবারিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আলোচনার বিষয়।

তিন বছরে ১০ হাজার ৭৩৮টি বিচ্ছেদ

জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বরিশাল জেলায় মোট ৩২ হাজার ১৩টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭৩৮টিতে।

বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৬৬৬টি বিয়ের বিপরীতে ৩ হাজার ৫টি বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়। ২০২৪ সালে বিয়ে নিবন্ধনের সংখ্যা কমে ৮ হাজার ৯৭৮টিতে দাঁড়ালেও বিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে হয় ৩ হাজার ৩৪৭টি। আর ২০২৫ সালে ১৩ হাজার ৩৬৯টি বিয়ের বিপরীতে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩৮৬টিতে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বার্ষিক বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা ১ হাজার ৩৮১টি বেড়েছে, যা প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি। অর্থাৎ, তিন বছরের ব্যবধানে বিচ্ছেদের বার্ষিক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—একই বছরে নিবন্ধিত বিয়ে ও বিচ্ছেদের সংখ্যার তুলনা করে ওই বছরের বিয়েগুলোর কত শতাংশ ভেঙেছে, তা নির্ধারণ করা যায় না। কারণ, কোনো বছরে নিবন্ধিত বিচ্ছেদের মধ্যে আগের বছরগুলোতে হওয়া বিয়েও থাকতে পারে। তারপরও বিচ্ছেদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা পারিবারিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

তালাক আবেদনে নারীর সংখ্যা বেশি

জেলা রেজিস্ট্রার মো. মোহছেন মিয়া জানিয়েছেন, তালাকের আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাঁর মতে, সামাজিক মূল্যবোধের ইতিবাচক পরিবর্তন না হলে ২০২৬ সালেও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে, এমনকি আরও বাড়তে পারে।

তবে নারীদের পক্ষ থেকে বেশি আবেদন আসার অর্থ এই নয় যে, সংসার ভাঙার জন্য নারীরাই বেশি দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতন, অবহেলা, যৌতুকের চাপ, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তি পেতেও নারীরা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আবার পুরুষেরাও নানা কারণে দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চান।

তাই আবেদনকারীর লিঙ্গের পরিসংখ্যান দিয়ে দায় নির্ধারণের পরিবর্তে বিচ্ছেদের পেছনের প্রকৃত কারণ, অভিযোগের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা জরুরি।

কেন ভাঙছে সংসার?

সমাজবিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে দাম্পত্য সম্পর্কের সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। পারিবারিক দূরত্ব, মানসিক অমিল, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অবিশ্বাস, যৌতুকের চাপ এবং প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সংসার শুরুর পর দায়িত্ব ভাগাভাগি, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, দুই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, সন্তান লালন-পালন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলোতে মতবিরোধ তৈরি হতে পারে। এসব বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে ছোটখাটো সমস্যা একসময় বড় সংকটে রূপ নেয়।

অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি, একে অপরের অনুভূতির প্রতি অবহেলা এবং মতের অমিলকে মেনে নেওয়ার অক্ষমতা সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ায়। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, অপমানবোধ ও অসম্মানও দাম্পত্য সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে।

অন্যদিকে, সংসারের ব্যয় নির্বাহে অক্ষমতা, বেকারত্ব, ঋণের চাপ কিংবা পরিবারের সদস্যদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের কারণ হতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যখন মানসিক চাপ যুক্ত হয়, তখন পারিবারিক অশান্তি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, আবেগে বিয়ে—পরে বাস্তবতার সংঘাত

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, অল্প সময়ে ঘনিষ্ঠতা এবং দ্রুত বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিচয়ের শুরুতে আবেগ, আকর্ষণ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা প্রবল থাকলেও বাস্তব সংসারজীবনে দায়িত্ব, আর্থিক সক্ষমতা, পারস্পরিক সমঝোতা এবং পরিবার পরিচালনার নানা চ্যালেঞ্জ সামনে আসে।

এ ক্ষেত্রে সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সম্পর্ককে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে পর্যাপ্ত পরিচয় ও বোঝাপড়া ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হতে পারে।

বিয়ের আগে পারস্পরিক মূল্যবোধ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, আর্থিক দায়িত্ব, সন্তান নেওয়ার বিষয়ে মতামত এবং দুই পরিবারের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হলে পরবর্তী সময়ে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে। আবেগের পাশাপাশি দায়িত্ববোধ ও বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখানেই।

নির্যাতন, যৌতুক ও মাদকাসক্তির অভিযোগও সামনে

বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে শুধু মানসিক অমিল বা আধুনিক জীবনযাপনের পরিবর্তনই দায়ী নয়। পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুকের দাবি, পরকীয়ার অভিযোগ, মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়া এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার মতো বিষয়ও অনেক দাম্পত্য সম্পর্ককে সংকটের মুখে ফেলতে পারে।

বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুকের চাপের অভিযোগকে কোনোভাবেই সাধারণ দাম্পত্য কলহ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, আইনি অধিকার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে উঠলেই সেটিকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। অভিযোগের যথাযথ যাচাই ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণের ভিত্তিতেই বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে।

কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, পরিচর্যার চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও দাম্পত্য জীবনে জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে অসুস্থতাকে কারও বিরুদ্ধে বিচ্ছেদের স্বয়ংক্রিয় যুক্তি হিসেবে দেখা উচিত নয়। সংকটের সময়ে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধই সম্পর্কের প্রকৃত পরীক্ষা।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

একটি দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে গেলে তার প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সন্তান থাকলে তাদের মানসিক নিরাপত্তা, পড়াশোনা, পারিবারিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ, ঘন ঘন ঝগড়া কিংবা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ শিশুদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। আবার নির্যাতন ও সহিংসতাপূর্ণ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তানের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে। তাই শুধু সংসার টিকিয়ে রাখাকেই একমাত্র লক্ষ্য না ধরে নিরাপদ, সম্মানজনক ও সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছেদের পরিস্থিতিতে সন্তানকে বিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা, তার সামনে একে অপরকে অপমান না করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।

অধ্যাপক শাহ সাজেদা: পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঘাটতি বড় সংকট

শিক্ষাবিদ ও সামাজিক সংগঠক অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, অনেক বিয়ে এখন পারস্পরিক বোঝাপড়া ছাড়া কেবল আবেগ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পর্কে ফাটল ধরছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সন্তান ও পারিবারিক স্থিতিশীলতার ওপর।

তাঁর বক্তব্যের আলোকে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিয়ের আগে ও পরে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে একটি বিয়ে সম্পন্ন হলেই দাম্পত্য জীবনের প্রস্তুতি শেষ হয় না। সংসার পরিচালনায় ধৈর্য, দায়িত্ববোধ, সম্মান, আর্থিক পরিকল্পনা এবং মতবিরোধ সমাধানের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাডভোকেট শাহিদা তালুকদার: মূল্যবোধের সংকটও বিবেচনায় নিতে হবে

ব্লাস্ট বরিশালের কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শাহিদা তালুকদার মনে করেন, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে মানুষের দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

তবে মূল্যবোধের আলোচনার পাশাপাশি ব্যক্তির অধিকার, সম্মান, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক দায়িত্বের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। সামাজিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধের নামে নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নামে সঙ্গীর প্রতি দায়িত্বহীন আচরণও সুস্থ সম্পর্কের পরিপন্থী।

একটি স্থিতিশীল দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সততা, সহমর্মিতা এবং মতবিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান অপরিহার্য।

পারিবারিক মামলা বাড়ছে, আদালতে উঠছে নানা অভিযোগ

আদালতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিক বিরোধ ও মামলা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম জানান, আইনি লড়াইয়ে আসা অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়ার প্রসঙ্গ উঠে আসছে।

তবে আদালতে উত্থাপিত অভিযোগ আর প্রমাণিত ঘটনা এক নয়। প্রতিটি মামলার বাস্তবতা আলাদা এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

পারিবারিক বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু আর্থিক ব্যয়ই বাড়ায় না, বরং দুই পক্ষের মানসিক চাপও বাড়াতে পারে। তাই নির্যাতন বা নিরাপত্তার ঝুঁকি না থাকলে এবং উভয় পক্ষ সম্মত হলে, প্রাথমিক পর্যায়ে নিরপেক্ষ কাউন্সেলিং ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ সমাধানের চেষ্টা কার্যকর হতে পারে। তবে কোনো পক্ষের ওপর জোর করে সম্পর্ক বজায় রাখার চাপ দেওয়া উচিত নয়।

প্রতিরোধের উপায় কী?

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিবাহবিচ্ছেদের প্রবণতা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, আইনগত সহায়তা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিয়ের আগে পারস্পরিক বোঝাপড়া, প্রত্যাশা ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা; দাম্পত্য জীবনে কার্যকর যোগাযোগ; অর্থনৈতিক পরিকল্পনা; প্রয়োজনে পেশাদার পারিবারিক কাউন্সেলিং; মাদকাসক্তি ও অনলাইন জুয়ার সমস্যায় সহায়তা; এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ—এসব উদ্যোগ সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে তালাকের আবেদন, নিষ্পত্তি, কারণ এবং নারী-পুরুষভিত্তিক পরিসংখ্যান নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এতে কোন ধরনের সমস্যা বেশি ঘটছে, কোন পর্যায়ে সহায়তা দেওয়া দরকার এবং কোথায় সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি—তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।

দায়ী কে—ছেলে, না মেয়ে?

বরিশালের ক্রমবর্ধমান বিবাহবিচ্ছেদের পরিসংখ্যানের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙার দায় কার?

বাস্তবতা হলো, সব বিচ্ছেদের দায় স্বামীর নয়, আবার সব বিচ্ছেদের দায় স্ত্রীরও নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতন বা দায়িত্বহীনতা একটি পক্ষের প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে। অন্য ক্ষেত্রে পারস্পরিক অবিশ্বাস, দীর্ঘদিনের বিরোধ, যোগাযোগের ঘাটতি কিংবা দুই পক্ষের অমিল সম্পর্ককে ভেঙে দিতে পারে।

নারীর তালাক আবেদনের সংখ্যা বেশি হওয়াকে নারীর দায় বেশি হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে, পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই যাচাই ছাড়া তাঁকে দায়ী করাও সঠিক নয়। প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট, অভিযোগ এবং প্রমাণ আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

বরিশালের এই পরিসংখ্যান তাই শুধু বিবাহবিচ্ছেদের হিসাব নয়; এটি পরিবার, সম্পর্ক, সামাজিক দায়িত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ। সংসার টিকিয়ে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই সংসারে নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।

প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—বরিশালে প্রতিদিন গড়ে নয়টি তালাকের আবেদন জমা পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ কী? স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস, অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক নির্যাতন, নাকি পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব? আপনার মতে, দায়ী কে—ছেলে, মেয়ে, নাকি সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতা?

মতামত জানান মন্তব্যে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি বিচ্ছেদের পেছনে রয়েছে আলাদা গল্প; তাই কাউকে দোষারোপ নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান।