নিজস্ব প্রতিবেদক :: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিভাগীয় শহর বরিশালসহ আশপাশের জেলাগুলোতে সন্ত্রাসীদের উত্থানের আলামত পাচ্ছেন এমপি প্রার্থীরা।
বরিশাল-৩ ও বরিশাল-৫ আসনের দুই এমপি প্রার্থী পৃথক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের আনাগোনা এবং বোমা তৈরির অভিযোগ তোলার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
নির্বাচনপূর্ব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য বার্তা রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সতর্ক করেছে। তবে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এমপি প্রার্থী কিংবা সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। খুব শিগগিরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অস্ত্র উদ্ধারসহ সন্ত্রাসীদের দমন করতে মাঠে নামবে। রাজনৈতিক পরিচয়ে কেউ সন্ত্রাস বা নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদেরও কঠোর হাতে দমন করা হবে।
বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সন্ত্রাসী উত্থানের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে তা রুখতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করা হবে। এমনকি প্রয়োজন হলে যৌথবাহিনীর অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিচয়ে কেউ যাতে অরাজক পরিবেশ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষ মহল থেকে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বরিশালসহ বিভাগের ছয় জেলার জেলা প্রশাসকদেরও বিশৃঙ্খলা রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সূত্রে আরও জানা যায়, সম্প্রতি বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং বরিশাল-৫ (সদর) আসনে বাসদের সংসদ সদস্য প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী পৃথক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের আনাগোনার বিষয়টি অভিযোগ আকারে তুলে ধরেন। তারা অভিন্ন বক্তব্যে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।
উভয় প্রার্থীর অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে নদীবেষ্টিত আসনগুলোতে ভয়ংকর অপরাধীরা আস্তানা গেড়ে বসেছে। তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও হাতবোমা তৈরির উপকরণ। ত্রয়োদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারা বরিশালজুড়ে ভীতিকর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চালাতে পারে।
সন্ত্রাসীদের মাথাচাড়া দেওয়ার আগাম আভাস পাওয়ার পর বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশও তৎপর হয়ে উঠেছে। বিভাগীয় শহরকে নিরাপদ ও শান্ত রাখতে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং চিহ্নিত অপরাধীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পাঁচ শতাধিক সন্ত্রাসীর একটি তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে কোতোয়ালি, কাউনিয়া, বিমানবন্দর ও বন্দর থানার পুলিশ জোরালো অভিযান চালাচ্ছে। প্রতিদিনই গড়ে দুই থেকে চার জনকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বুধবার সন্ধ্যায় জানান, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে মহানগরীতে খুব শিগগিরই বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সেনাবাহিনী, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট একত্রিত হয়ে অস্ত্র উদ্ধার এবং চাঁদাবাজ-সন্ত্রাস দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে বিভাগের ছয়টি জেলার জেলা প্রশাসকরাও নির্বাচনের আগে সন্ত্রাসীদের রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন জানান, ‘জেলার ছয়টি আসনে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে যৌথবাহিনী মোতায়েনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার পুলিশ সুপারদেরও অনুরূপ নির্দেশনা দিয়েছেন বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ। তিনি বলেন, ‘সবার আগে দেশ, এই ব্রত সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে।’ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শিগগিরই বরিশাল বিভাগজুড়ে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও ডেভিল হান্টে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ পুরোপুরি প্রস্তুত।’
বরিশালের বিভিন্ন উপজেলা, বিশেষ করে উজিরপুর, বাবুগঞ্জ ও বানারীপাড়া একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত সর্বহারা অধ্যুষিত এলাকা ছিল। এ প্রসঙ্গে ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, ‘সর্বহারাদের কার্যক্রম এখন শেষ পর্যায়ে। তাদের ব্যবহৃত অস্ত্র এখনো কোথাও রয়ে গেছে, এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অস্ত্র থেকে থাকলে তা উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নির্বাচনের আগে বরিশাল বিভাগের ২১টি আসন অপরাধমুক্ত করার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথবাহিনী মাঠে নামবে, এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বুধবার সন্ধ্যায় রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ‘স্ব স্ব জেলার ডিসি ও এসপিদের এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট শিগগিরই মাঠে নামছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অরাজকতা বা নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাহলে তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।