নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে প্রভাবশালীর জমি বাঁচাতে খালের গতিপথ পরিবর্তন।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) বাস্তবায়নাধীন বরিশাল–ভোলা–ঝালকাঠি–পিরোজপুর জেলা সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বরিশালের চরকাউয়া ইউনিয়নে খাল খননের কাজে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে উঠেছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের পানি সংকট দূর করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রকল্পই এখন হয়েছে একটি প্রভাবশালী মহলের ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে চরকাউয়া ইউনিয়নের কাউয়ারচর মৌজায় ২ কিলোমিটার স্বনির্ভর খাল খননের কাজ অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বিএডিসি বরিশাল নির্মাণ জোন। ঠিকাদারি কাজ পায় মেসার্স আজমাইন এন্টারপ্রাইজ, ৩০৭/১ মেরাদিয়া, খিলগাঁও, ঢাকা। প্রকল্পের নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, মূল ম্যাপ ও নকশা অনুযায়ী খাল খনন করতে হবে।
এই খাল খননের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের পানি সংকটে থাকা হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি সেচের আওতায় আনার কথা ছিল। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শনের পরই এই প্রকল্প অনুমোদন পায়। কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো এবং কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, মূল ম্যাপ অনুসরণ না করে পরিকল্পিতভাবে খালের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। যেসব জমির ওপর দিয়ে ম্যাপ অনুযায়ী খাল যাওয়ার কথা, সেসব জমি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়ে অন্য সাধারণ কৃষকের জমির ভেতর দিয়ে খাল কাটা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিরীহ কৃষকরা।
এই অনিয়মের মূল হোতা চরকাউয়া ইউনিয়নের প্রভাবশালী ২নং ওয়ার্ডের সাগর মেম্বার ও তার সহযোগী এক কথিত সাংবাদিক। এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের সরাসরি নির্দেশেই খাল খননের দিক পরিবর্তন করা হচ্ছে। ম্যাপ অনুযায়ী সাগর মেম্বারের নিজের জমির ওপর দিয়ে খাল প্রবাহিত হওয়ার কথা থাকলেও তা এড়িয়ে পাশের জমিতে খনন চালানো হচ্ছে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে সাগর মেম্বার প্রায় ১০০ শতাংশ জমি কিনে সেখানে প্লট ব্যবসা শুরু করেন। ওই জমির মধ্য দিয়ে খালের অস্তিত্ব থাকলেও তিনি খাল দখল করে নিজের উদ্যোগে একটি কালভার্ট নির্মাণ করেন এবং সীমানা প্রাচীর গড়ে তোলেন। মূল ম্যাপ অনুযায়ী খাল খনন হলে সেই কালভার্ট ও স্থাপনা খালের ভেতরে পড়ে যাওয়ার কথা। এই কারণেই খাল ঘুরিয়ে অন্যের জমির ভেতর দিয়ে কাটার অভিযোগ উঠেছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাব-কন্ট্রাক্ট নেওয়া একটি চক্র এই অপকর্ম বাস্তবায়ন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের নকশা ও নির্দেশনা উপেক্ষা করে সাগর মেম্বারের জমি রক্ষায় প্রকল্পের কাঠামো বদলে দেওয়া হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কৃষকের স্বার্থে নেওয়া একটি সেচ প্রকল্পকে ব্যক্তি সাগর মেম্বারের জমি ও অবৈধ স্থাপনা রক্ষার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। খাল খননের নামে কৃষকের জমি কেটে নেওয়া হলেও প্রকৃত উপকার পাচ্ছেন না প্রকৃত কৃষকরা।
এ ব্যাপারে খাল খননের সাব কন্ট্রাক্টর রাহাত জানান, সাগর মেম্বারের জমির ওইখান থেকে একটু ভুল হয়েছে। পরবর্তীতে আমরা ঐখান থেকে কাটবো।
এই অবস্থায় এলাকাবাসী দ্রুত প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করছেন। তারা চান, মূল ম্যাপ অনুযায়ী খাল খনন, সাগর মেম্বারের ভূমিকা তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা। অন্যথায় কৃষি উন্নয়নের নামে চলমান এই প্রকল্প ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্নীতি ও দখলবাজির দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
এ ব্যাপারে চড়কাউয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, শুনেছি খাল খননে অনিয়ম হয়েছে। তবে কেউ অভিযোগ দেয়নি, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।
এ বিষয়ে জানার জন্য সাগর মেম্বারের মুঠোফোনে কল দিলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।