
নিজস্ব প্রতিবেদক :: অবশেষে অবৈধ স্থাপনার দখলমুক্ত হলো বরিশাল নগরীর অন্যতম প্রধান বিনোদনকেন্দ্র বেলস পার্ক। দীর্ঘদিন ধরে পার্কের ভেতরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও দখলদারত্বের কারণে যে পরিবেশগত ও বিনোদনগত সংকট তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে অভিযান চালিয়ে পার্কটিকে দখলমুক্ত করেছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। নগরবাসীর অবাধ চলাচল, নির্মল পরিবেশে সময় কাটানো এবং পার্কের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরিশাল মহানগরীর ‘প্রাকৃতিক অক্সিজেন কারখানা’ হিসেবে পরিচিত বেলস পার্ক শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়; এটি নগরবাসীর হাঁটাচলা, শরীরচর্চা, অবসরযাপন এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সী মানুষ এই পার্কে আসেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পার্কের অভ্যন্তরে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠা এবং বিভিন্ন ধরনের দখলদারত্বের অভিযোগে এর স্বাভাবিক পরিবেশ ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল।
নগর প্রশাসনের উদ্যোগে অবশেষে পার্কটি অবৈধ স্থাপনা থেকে মুক্ত হওয়ায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে নগরবাসীর মধ্যে। তবে শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেই দায়িত্ব শেষ নয়, পার্কটি যেন আবারও দখলদারদের কবলে না পড়ে, সে জন্য নিয়মিত তদারকি ও কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সচেতন মহল।
প্রশাসক শিরীনের কঠোর অবস্থান, শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান
সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন দায়িত্ব গ্রহণের পর নগরীর বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রকে অবৈধ দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় বেলস পার্ককে দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে একাধিকবার বেলস পার্ক থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে পার্কের ভেতরের স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সরানো সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে পার্কের ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী কেডিসি সড়কের পাশে বিকল্প স্টল নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়। তারপরও পার্কের অভ্যন্তরে অবৈধ স্থাপনা টিকে থাকায় উচ্ছেদ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
এ অবস্থায় বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন নগর প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। গত সপ্তাহে পার্কের ভেতরে থাকা অবৈধ স্থাপনাগুলো অপসারণে জোরালো অভিযান শুরু করা হয়। ধারাবাহিক এই উদ্যোগের ফলে বর্তমানে বেলস পার্ককে অবৈধ দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে।
দখলদারত্বের পেছনে কারা, উঠছে প্রশ্ন
বেলস পার্কে বারবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরও অবৈধ স্থাপনা টিকে থাকার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পার্ককেন্দ্রিক কিছু চাঁদাবাজ চক্র এবং সিটি করপোরেশনের কতিপয় অসাধু নিরাপত্তাকর্মীর যোগসাজশে অবৈধ স্থাপনাগুলো টিকিয়ে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া ছাড়া কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে প্রয়োজন হলে প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠতে পারে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, বেলস পার্কের অবৈধ দখলমুক্তির মধ্য দিয়ে শুধু স্থাপনা উচ্ছেদ নয়, বরং পার্ককে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দখলদারত্বের অভিযোগ নিরসনেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রবেশদ্বারে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা
উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি বেলস পার্কের নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পার্কের সবকটি প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, উচ্ছেদের পর যেন নতুন করে কোনো অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে এবং পার্কের জায়গা ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি না হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরীর উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ পরিবেশ রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একবার দখলমুক্ত করার পর যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে আবারও দখলদারত্ব ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। তাই নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্বশীলতা, প্রশাসনের নিয়মিত পরিদর্শন এবং নাগরিক সচেতনতা—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শুধু বেলস পার্ক নয়, অন্য বিনোদনকেন্দ্রও দখলমুক্ত করার দাবি
বেলস পার্ক দখলমুক্ত হওয়ার পর নগরবাসীর প্রত্যাশা এখন বরিশালের অন্যান্য পার্ক, লেকের পাড় ও উন্মুক্ত স্থান ঘিরে। তাঁদের মতে, নগরীর পরিবেশ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে সব সরকারি ও জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গা অবৈধ দখল থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে নগরীর মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, নবগ্রাম রোড-চৌমাথা লেকের পাড়, আমতলা মোড়ের স্বাধীনতা পার্ক এবং ত্রিশ গোডাউন এলাকার শতায়ু অঙ্গনের মতো স্থানগুলোতেও প্রয়োজনীয় নজরদারি ও দখলমুক্ত কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নগরবাসী।
তাঁদের অভিযোগ, নগরীর বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র ও উন্মুক্ত স্থানের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে এসব স্থান থেকে বঞ্চিত হবেন। একই সঙ্গে সবুজ পরিবেশ, হাঁটাচলার জায়গা এবং পরিবার নিয়ে অবসর কাটানোর সুযোগও সংকুচিত হবে।
দখলমুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
বেলস পার্ককে অবৈধ দখলমুক্ত করা নগর প্রশাসনের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই অবস্থা ধরে রাখা। পার্কের জায়গা পুনরায় দখল হওয়া ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান, নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই, অভিযোগ গ্রহণ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের ঘোষিত উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বরিশালের সব পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ রাখা হবে। পাশাপাশি অবৈধ দখলদারত্বের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কারণ, একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে শুধু সড়ক, ভবন কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পর্যাপ্ত সবুজ জায়গা, উন্মুক্ত পরিবেশ এবং নাগরিকদের অবাধে বিনোদন গ্রহণের সুযোগ।
বেলস পার্কের দখলমুক্তি সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন নগরবাসীর চোখ—এই উদ্যোগ কতটা টেকসই হয় এবং বরিশালের অন্যান্য বিনোদনকেন্দ্রেও একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেদিকে।

