
নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালের উজিরপুর উপজেলা যেন এখন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে অবৈধ ক্লিনিক, ভুয়া চিকিৎসক আর অপচিকিৎসার এক ভয়ঙ্কর অভায়রণ্যে। প্রশাসনের চোখের সামনেই বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট, যেখানে মাসোহারা, প্রভাব এবং দুর্নীতির নগ্ন ছায়ায় সাধারণ মানুষের জীবন ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যুর মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, দালালচক্র এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে উপজেলার একাধিক লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে অপচিকিৎসার ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্য। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কতিপয় কর্মকর্তাদের নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে বন্ধ হয়ে যায় সবধরনের অভিযান, নজরদারি এবং আইনি ব্যবস্থা। ফলে পুরো উপজেলাজুড়ে গড়ে উঠেছে এক ধরনের ‘অদৃশ্য সুরক্ষা বলয়’, যার ভেতরে চলছে চিকিৎসার নামে মৃত্যুর ব্যবসা।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত উপজেলার পশ্চিম সাতলা এলাকার মায়ের দোয়া ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের মালিক রেজাউল করিম দাখিল পাস হলেও বছরের পর বছর নিজেকে “এমবিবিএস ডাক্তার” পরিচয়ে পরিচিত করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো বৈধ মেডিকেল ডিগ্রি বা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই তিনি সিজার, টিউমার, অ্যাপেন্ডিক্স এমনকি ক্যান্সারের মতো জটিল অস্ত্রোপচার পর্যন্ত পরিচালনা করছেন। শুধু তাই নয় সাম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবৈধ ক্লিনিকটিতে দুইজন নারীর সঙ্গে দাখিল পাশ করে নিজেকে এমবিবিএস ডাক্তার দাবী করা ভুয়া ডাক্তার রেজাউল করিমের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
এই অবৈধ চিকিৎসা কার্যক্রমের ভয়াবহ পরিণতিও নীরব নয়। স্থানীয়দের দাবি, ভুল চিকিৎসা, চরম অবহেলা এবং অদক্ষ অস্ত্রোপচারের কারণে একাধিক রোগীর মৃত্যু ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ভয়, সামাজিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের হুমকি এবং রহস্যজনক চাপের কারণে অধিকাংশ পরিবারই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে একের পর এক ভয়াবহ ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে নীরবতার অন্ধকারে। ইতোমধ্যে রেজাউল করিম উপজেলা ভ্রাম্যমান আদালতের রায়ে কারাবরণ করলেও জামিনে বের হয়ে তিনি পূর্ণরায় তার রমরমা ব্যবসা করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভেতরের একটি চক্রকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী আগাম অভিযানের তথ্য ফাঁস, রোগী ভাগাভাগি এবং রেফার বাণিজ্যের মাধ্যমে এই অবৈধ ক্লিনিক সিন্ডিকেটকে সরাসরি সহায়তা করছে। স্থানীয়দের ভাষায়, “স্বাস্থ্যসেবা এখন আর সেবা নেই, এটি পরিণত হয়েছে কমিশন আর মৃত্যুবাণিজ্যের এক নিষ্ঠুর খেলায়।”
জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে রেজাউল করিমকে জেল ও জরিমানা করা হলেও অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় তিনি বারবার ফিরে এসে পুনরায় একই কার্যক্রম চালু করেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, আতঙ্ক এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ক্রমেই বাড়ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই ভুয়া চিকিৎসা সাম্রাজ্যকে কারা এতোদিন ধরে রক্ষা করছে?
অভিযোগের ব্যাপারে অভিযুক্ত রেজাউল করিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উল্লেখিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে তার চেম্বারে চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এসএম মাইদুল ইসলাম বলেন, “অবৈধ ক্লিনিক বা ভুয়া চিকিৎসকদের কোনো ধরনের সহযোগিতা করার প্রশ্নই আসে না। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

