ঢাকাসোমবার , ২২ জুন ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কে হচ্ছেন বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুন ২২, ২০২৬ ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
১৬৬

নিজস্ব প্রতিবেদক :: কে হচ্ছেন বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান

বরিশাল বিভাগ ঘোষণা হয়েছে ১৯৯৩ সালে। প্রায় একদশক পর ২০০২ সালে পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয় নগরী। কিন্তু বিভাগ ঘোষণার ৩৩ বছর পরও প্রশাসনিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারেনি দক্ষিণাঞ্চলের এই বিভাগীয় শহর। শ্রম, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও পরিবেশ আদালত, ডাক বিভাগের আঞ্চলিক কার্যক্রম, বিসিক, আয়কর, ভূমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবার জন্য এখনো খুলনার দ্বারস্থ হতে হয় বরিশালবাসীকে। তবে শেষ পর্যন্ত বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
জানা গেছে, বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির মুখে বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এর চেয়ারম্যান পদ ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।

বিভাগীয় পোস্ট অফিসের নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন বলেন, ইতিপূর্বে জেলা প্রশাসক জসিমউদ্দীন হায়দারের সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির পর আঞ্চলিক ডাক বিভাগের কার্যক্রম চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জেলা ডাকঘরের ভবনসহ কয়েকটি অবকাঠামোগত কাজও এগিয়েছিল। কিন্তু লোকবল সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতায় সেই উদ্যোগ আবারও থমকে গেছে। ফলে বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ডাক প্রশাসন এখনো খুলনা থেকেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

একই চিত্র বরিশাল ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান বিসিকের ক্ষেত্রেও। বিসিক শিল্পনগরী মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খান বলেন, বিসিক-সংক্রান্ত অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য এখনো খুলনায় যেতে হয়। এতে উদ্যোক্তাদের সময়, অর্থ ও শ্রম তিনটিই নষ্ট হচ্ছে।
বরিশালের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ দুলাল, অধ্যাপক তপংকর চক্রবর্তী এবং শিক্ষক নেতা অধ্যাপক ফরিদুল আলম জাহাঙ্গীর তালুকদার বলেন, পদ্মা সেতু, পায়রা বন্দর ও বেকুটিয়া সেতু দক্ষিণাঞ্চলের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে ভোলা থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো এখনো খুলনাকেন্দ্রিক থাকলে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ডাক বিভাগ, বিসিক, পরিবেশ অধিদপ্তর, জাদুঘরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এখনো খুলনা-নির্ভর। বিভাগ ঘোষণার তিন দশক পরও এই পরিস্থিতি বরিশালের জন্য অমর্যাদাকর। তাঁর মতে, জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত এসব আঞ্চলিক কার্যালয় বরিশালে স্থানান্তর করতে হবে।

 

বরিশালের প্রশাসনিক স্বনির্ভরতার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের মধ্যেও তখন একই সুর পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু সবকিছু আটকে ছিলো বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উপর। একবাক্যে সবাই সহমত পোষণ করে আওয়াজ তুলেছিলেন আগে বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন হতে হবে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতারা এ বিষয়ে একই বক্তব্য দিলেও কার্যত তাদের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

অন্যদিকে বিএনপি নেতারাও দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কেন্দ্রীয় সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমতুল্লাহ, নগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, বরিশালের উন্নয়ন এতদিন অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক ছিল, কিন্তু নগর পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি ‘বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরমধ্য দিয়ে বহু প্রতীক্ষিত বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের পথ উন্মুক্ত হয়। সরকারের নীতিগত অনুমোদনের পর দেশের আটটি শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হলেও বরিশালের সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে রয়েছে। বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, চেয়ারম্যান পদের জন্য একাধিক নেতার নাম সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, এবায়েদুল হক চাঁন, মনিরুজ্জামান খান ফারুক, আবুল কালাম শাহীন, জিয়া উদ্দিন সিকদার, মীর জাহিদুল কবির জাহিদ। এর বাইরে আরও কয়েকজন নেতা নীরবে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, এই নগরের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে যিনি জানেন, এমন একজন স্থানীয় ব্যক্তিকেই চেয়ারম্যান করা উচিত। আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ বলেন, তিনি কোনো পদ-পদবির আকাঙ্খা করেন না। তবে সরকার দায়িত্ব দিলে তা যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করবেন।

সম্প্রতি ‘নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে বরিশালের উন্নয়নের বড় অংশই ছিল অপরিকল্পিত। বর্ধিত এলাকার উন্নয়ন, পরিকল্পিত বাস টার্মিনাল, খেলার মাঠ ও জলাশয় সংরক্ষণ, নিরাপদ পার্কিং ব্যবস্থা, ওভারব্রিজ নির্মাণ এবং আগামী ২৫ বছরের নগর পরিকল্পনা নিয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির দাবি ওঠে।

 

বরিশালের সাধারণ নাগরিক সমাজের পক্ষে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবিএম মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীক এসময় বলেন, বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ শুধু ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান হবে না; এটি নগরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। তাই এমন একজন চেয়ারম্যান প্রয়োজন, যিনি বরিশালকে জানেন, বরিশাল নিয়ে ভাবেন এবং নগরের মাঠ, জলাশয় ও পরিবেশ রক্ষায় আপসহীন থাকবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার বলেন, খুলনা-নির্ভর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম বরিশালে স্থানান্তরের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এই মুহূর্তে অবগত নন। কাগজপত্র দেখে বলতে পারবেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, দীর্ঘ ৩৩ বছর আমরা বিভাগীয় সুযোগ সুবিধাবঞ্চিত। আমাদের ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত আমরা। এটা চরম বৈষম্য। আমার প্রথম দাবী হচ্ছে সব বিভাগীয় শহর যেসব সুবিধা পাচ্ছে আমাকেও সেসব সুবিধা দিতে হবে। আর এরসাথে যদি বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকা জড়িয়ে থাকে তাহলে আর একটু অপেক্ষা করতে হবে।