ঢাকাMonday , 10 August 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দালালচক্রের দৌরাত্মে ভারত ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন বরিশালের মানুষ

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৫৫

নিজস্ব প্রতিবেদক :: দালালচক্রের দৌরাত্মে ভারত ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন বরিশালের মানুষ।

 

দালালচক্রের অবৈধ তৎপরতায় ভিসা আবেদন জমাদানের স্লট পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, দীর্ঘদিন ভিসা কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের নিরাপত্তা নিয়ে নানা খবরসহ সব মিলিয়ে ভারতীয় পর্যটন ভিসা চালু হলেও বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে ভারত ভ্রমণে আগের মতো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে কলকাতাকেন্দ্রিক পর্যটন, চিকিৎসা ও কেনাকাটার জন্য যারা নিয়মিত ভারতে যাতায়াত করতেন, তাদের অনেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বরিশালের একাধিক ভ্রমণেচ্ছু ও ভিসা-সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। গত প্রায় দুই বছর ভারতীয় পর্যটন ভিসা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এরই মধ্যে অনেকে বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, চীন, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপকে বেছে নিয়েছেন। ফলে দীর্ঘ সময় পর পর্যটন ভিসা চালু হলেও আগের সেই আগ্রহ এখনো ফিরেনি।

গত তিন দশকে বহুবার ভারত ভ্রমণ করেছেন এমন একাধিক ব্যক্তি জানান, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেখানে মুসলিমদের হয়রানি বা নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের মতে, পরিস্থিতি আরও পর্যবেক্ষণ করে তারপর পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারত ভ্রমণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ।

ভিসা স্লট নিয়ে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য
পর্যটন ভিসা চালুর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভিসা আবেদনপত্র জমাদানের স্লট পাওয়া নিয়ে দালালচক্রের তৎপরতা। বরিশালের একাধিক কল সেন্টার ও অনলাইন সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি শ্রেণির দালাল আবেদনকারীদের কাছ থেকে ভিসা আবেদনপত্র জমাদানের সময় নির্ধারণ বা স্লট সংগ্রহের নামে অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঢাকায় ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্রের স্লট নিয়ে কিছু দালালচক্রের তৎপরতার কারণে সাধারণ আবেদনকারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু কল সেন্টারের মাধ্যমে একটি ভিসা আবেদনপত্র জমাদানের স্লটের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

 

ফলে আবেদনকারীদের অনেকের ক্ষেত্রে ভিসা প্রক্রিয়ার শুরুতেই বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বাড়তি খরচও ভারতীয় ভিসা নেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
বিকল্প গন্তব্যে ঝুঁকছেন ভ্রমণেচ্ছুরা

দীর্ঘদিন ভারতীয় ভিসা বন্ধ থাকায় বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেকেই ইতোমধ্যে বিকল্প ভ্রমণ ও চিকিৎসা গন্তব্য বেছে নিয়েছেন। বিশেষ করে যারা আগে চিকিৎসার জন্য চেন্নাই, দিল্লি কিংবা বেঙ্গালুরু যেতেন, তাদের অনেকে এখন থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ভ্রমণসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ঢাকায় বসেই চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ভিসা আবেদন, বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকায় ব্যাংককে চিকিৎসা নিতে আগ্রহ বাড়ছে। একইভাবে চীনের বিভিন্ন শহরের বিশ্বমানের হাসপাতালেও চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ সহজ হওয়ায় অনেকে সেদিকেও ঝুঁকছেন।

পর্যটনের ক্ষেত্রেও শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন বিকল্প গন্তব্য দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভিসা চালু হলেও দক্ষিণাঞ্চলের উপস্থিতি নগণ্য
জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভ্রমণ, চিকিৎসা ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ভারতে যেতেন। এর মধ্যে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভিসা সংগ্রহ সহজ করতে বরিশালেও ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্র চালু করা হয়েছিল।

তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পর্যটন ভিসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা ভিসার ক্ষেত্রেও আগের মতো আবেদন না থাকায় ২০২৫ সালের শুরুতে বরিশালে দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রটি যে ভবনে পরিচালিত হতো, সেই ভবনের মালিকের সঙ্গে চুক্তিও বাতিল করা হয় এবং কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হলেও বরিশাল থেকে ঢাকায় গিয়ে আবেদন করার কারণে অনেকেই বাড়তি বিড়ম্বনার কথা বলছেন। ভিসা আবেদনের জন্য ঢাকায় সরাসরি উপস্থিত হওয়া এবং পরবর্তীতে পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য আবার সেখানে যাওয়ার বিষয়টিও অনেকের কাছে সময় ও অর্থসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বরিশালে ভিসা কেন্দ্র কবে চালু হবে?
ভারতীয় পর্যটন ভিসা চালুর পর দেশটির হাইকমিশনের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভিসা আবেদনকেন্দ্র চালুর কথা বলা হলেও বরিশালে কবে আবার ভিসা আবেদনকেন্দ্র চালু হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি কমেনি।
বরিশালের কয়েকটি কল সেন্টার ও অনলাইন ভিসা-সেবা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক মানুষ এখনো ভারতীয় ভিসা সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তবে আগের তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক কম। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা বর্তমানে খোঁজ নিতে আসছেন, তাদের বড় একটি অংশ প্রথমেই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ভিসা সংগ্রহে অতিরিক্ত খরচের বিষয়ে জানতে চাইছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আগে ভারতীয় ভিসার আবেদনকারীদের বড় অংশই কলকাতা ও এর আশপাশের এলাকায় ভ্রমণ, কেনাকাটা কিংবা চিকিৎসার জন্য যেতেন। বর্তমানে সেই আগ্রহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

কলকাতার ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশাতেও ভাটা
বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর খবরে কলকাতার হোটেল, রেস্টুরেন্ট, শাড়ি ও তৈরি পোশাকের দোকান, প্রসাধনী ব্যবসায়ী এবং মানি চেঞ্জারদের মধ্যে শুরুতে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমনের প্রত্যাশায় অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও আধুনিকায়নও করে।
তবে বাস্তবে প্রত্যাশিত হারে বাংলাদেশি পর্যটক না আসায় সেই আশায়ও ভাটা পড়েছে বলে কলকাতার ব্যবসায়ীদের একটি অংশ জানিয়েছেন।

 

কলকাতার ‘বাংলাদেশ পল্লী’ হিসেবে পরিচিত মারকুইস স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদোয়াই স্ট্রিট, নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন লিন্ডসে স্ট্রিট, বড়বাজার এলাকার জাকারিয়া স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিটসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা এখনো প্রত্যাশিত ক্রেতা পাচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন।

 

 

 

 

ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের দাবি, আগে যেসব হোটেলে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য কক্ষ পাওয়া কঠিন ছিল, বর্তমানে সেসব হোটেলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কক্ষ খালি থাকছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বরিশালের ভ্রমণেচ্ছুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারত ভ্রমণের ক্ষেত্রে এখন ভিসা পাওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মুসলিমদের নিয়ে বিভিন্ন বিতর্কিত বক্তব্য ও কর্মকা- এবং বাংলাদেশিদের হয়রানির বিভিন্ন খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একাধিক ভ্রমণেচ্ছুর ভাষ্য, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য তারা শুনেছেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ঘটনা ও অভিযোগের খবর প্রকাশিত হওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানে ভ্রমণের বিষয়ে তারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

 

তাদের মতে, পর্যটন ভিসা চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও সাধারণ মানুষের ভ্রমণ সিদ্ধান্তে নিরাপত্তা, ভিসা প্রক্রিয়ার সহজলভ্যতা এবং ব্যয়ের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন পর ভারতীয় পর্যটন ভিসা চালু হলেও বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে ভারতে যাতায়াতের আগের প্রবাহে এখন অনেকটাই ভাটির টান দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ, সহজ ও স্বচ্ছ ভিসা প্রক্রিয়া চালু এবং বরিশালে পুনরায় ভিসা আবেদনকেন্দ্র চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।