ঢাকামঙ্গলবার , ২৩ জুন ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে এমপির নির্দেশ, বরগুনায় প্রকৌশলীর অডিও ফাঁস

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুন ২৩, ২০২৬ ১২:১০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬০

নিজস্ব প্রতিবেদক :: পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে এমপির নির্দেশ, বরগুনায় প্রকৌশলীর অডিও ফাঁস।

বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মো. অলি উল্লাহর পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডার (দরপত্র) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তালতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে। আরএফকিউ পদ্ধতির দরপত্র এমন গোপনে সম্পন্ন করা হয়েছে, যাতে সাধারণ ঠিকাদাররা অংশগ্রহণের সুযোগই না পান বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর দুটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছে। ওই অডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, সংসদ সদস্যের নির্দেশে পাঁচটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি লাইসেন্স দরপত্র দাখিল করেছে এবং তাদের মধ্য থেকেই একজন কাজ পাবেন। একইভাবে আমতলী ও বরগুনা সদর উপজেলাতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অডিওতে উপজেলা প্রকৌশলীকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে আমাদের লোকজন কাজ পায় না, অন্য লোকজন কাজ পায়। এরপর থেকে এমপিদের সম্মানিত করার জন্য এডিপি থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

একপর্যায়ে তিনি বিরক্তির সুরে বলেন, ‘আপনাদের সমস্যা হয়েছে এখানে হাতপাখা থেকে এমপি হইছে। বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হলে আপনারা এখানে জিজ্ঞেস করতে আসতেন না।’

এ ছাড়া তিনি দাবি করেন, এমপির দেওয়া নামের বাইরে অন্য কেউ এই টেন্ডারের বিজ্ঞপ্তি দেখতে পারবেন না এবং ওই পাঁচজন ছাড়া অন্য কেউ দরপত্র জমা দিতে পারবেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে তালতলী উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) চতুর্থ ধাপে ৩৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দকৃত অর্থ সংসদ সদস্যের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

গত ৩ জুন উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে প্রকল্প বাছাই কমিটির সভায় আগের তিন ধাপের ঘাটতি হিসেবে ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা সংরক্ষণ রেখে অবশিষ্ট অর্থের মধ্যে ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার প্রকল্প ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি)’ মাধ্যমে এবং ২১ লাখ ৯৬ হাজার টাকার ১৭টি প্রকল্প আরএফকিউ পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত রেজুলেশনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রকৌশলী স্বাক্ষর করেন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে আরএফকিউ পদ্ধতির নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ২১ লাখ ৯৬ হাজার টাকার ১৭টি প্রকল্পকে চারটি প্যাকেজে ভাগ করে ই-জিপিতে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কিন্তু টেন্ডার নোটিশ এমন কৌশলে গোপন রাখা হয়, যাতে সাধারণ ঠিকাদাররা বিষয়টি জানতে না পারেন।

স্থানীয় ঠিকাদার ইমরান হোসেন বলেন, ‘উপজেলার প্রায় ৪০-৫০ জন নিবন্ধিত ই-জিপি ঠিকাদার দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিয়ে আসছি। কিন্তু চলমান এই আরএফকিউ টেন্ডারের বিষয়ে আমাদের অধিকাংশ ঠিকাদারই কিছু জানতেন না। পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে গোপন রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যোগ্য ঠিকাদারদের তথ্য না জানিয়ে সীমিত কয়েকজনকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই এই লুকোচুরি করা হয়েছে। একটি বিশেষ চক্রকে কাজ পাইয়ে দেওয়ায় আমরা দরপত্র জমা দেওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পাইনি।’

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেনের ভাষ্য, ‘এডিপির চতুর্থ ধাপের বরাদ্দের চিঠিতে সংসদ সদস্যের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ আছে। জাতীয় সংসদে এক সংসদ সদস্য বলেছিলেন, তাঁর দলীয় লোকজন কাজ পায় না। এরপর থেকেই দেশের প্রতিটি সংসদ সদস্যের অনুকূলে এ ধরনের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে ২১৩ জন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য রয়েছেন, সেখানে কেউ প্রশ্ন করে না। যেখানে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য নেই, সেখানেই এসব প্রশ্ন ওঠে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে তাঁর ভাগ্নে ও ব্যক্তিগত সহকারী মো. মামুন জানিয়েছেন, ‘আমি তালতলী উপজেলা প্রকৌশলীকে কয়েকটি লাইসেন্স দিয়েছিলাম। তবে কাজ পেয়েছি কিনা জানি না। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যের কোনো নির্দেশনা ছিল না।’

তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বরাদ্দ পাওয়ার পর সংসদ সদস্যের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী কমিটির সভায় প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। এরপর উপজেলা প্রকৌশলীকে ই-জিপির মাধ্যমে দ্রুত কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে হোপ আইডি থেকে রেসপন্সিভ দরদাতাদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে অনিয়মের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’