
মাইদুল ইসলাম শফিক, বানারীপাড়া :: পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটলেও ভান্ডারিয়া-বানারীপাড়া-ঢাকা নৌরুটে নেমে এসেছে স্থবিরতা। এক সময়ের অতীব ব্যস্ত ঐতিহ্যবাহী এই রুটে এখন আর আগের মতো দেখা মেলে না বিশালাকৃতির লঞ্চগুলোর। মাঝে মধ্যে ‘রাজদূত প্রাইম’ ও তার ব্যানারে ‘আল-আরাফাত’ নামের একটি লঞ্চ চলাচল করলেও, ২০২৬ সালের পবিত্র ঈদুল আজহার পর থেকে এ রুটে আর কোনো নিয়মিত লঞ্চের দেখা মেলেনি। বর্তমানে কেবল ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহার সময়ই বিশেষ পরিষেবা ছাড়া লঞ্চ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে।
একইভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম নৌরুট ঢাকা-বৈঠাকাটা রুটের বৈঠাকাটা, চৌমোহনা ও হারতা থেকেও একসময় প্রচুর পরিমাণে মালামাল লঞ্চে পরিবহন করা হতো। তবে বর্তমানে সেই রুটটিও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
পূর্বে এ রুটে চলাচলকারী নিয়মিত যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাসে চেপে যেখানে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব, সেখানে লঞ্চে সময় লাগছে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা। লঞ্চ ও বাসের টিকিটের মূল্যে বড় ধরনের তফাত না থাকায় যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই স্বল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে সড়কপথকে বেছে নিচ্ছেন।
অথচ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পূর্বেও এই রুটে টিপু-১২, পারাবত-৮, অগ্রদূত প্লাস, রাজদূত প্রাইম, মর্নিংসান-৯, ঈগল-৮, যুবরাজ-৭ সহ বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল লঞ্চ দৈনিক দু’টি করে রোটেশনের মাধ্যমে সেবা দিত। পরবর্তীতে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় যাত্রী সংকট ও অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের মুখে পড়ে লঞ্চ মালিকরা ধারাবাহিকভাবে লোকসানের শিকার হন, যা শেষ পর্যন্ত রুটটি সম্পূর্ণ বন্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
বানারীপাড়া বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা থেকে পাইকারি মালামাল পরিবহনে লঞ্চ ছিল তাঁদের প্রথম পছন্দ, কারণ নৌপথে খরচ হতো অত্যন্ত কম। বর্তমানে বাধ্য হয়ে সড়কপথে মালামাল আনায় তাঁদের পরিবহন খরচ বহু গুণ বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পণ্যের বাজারে।হুলারহাট,কাউখালি,
স্বরূপকাঠি, ইন্দেরহাট, বানারীপাড়া, মীরেরহাট ও চৌধুরীর হাট ঘাটগুলো অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কেন্দ্র। ঋতুভেদে এ অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে আমড়া, চালতা, সুপারি, ডাব, কলা ও চাল নৌপথে মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর ও ঢাকায় পাঠাতেন কৃষি পণ্য ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে স্বরূপকাঠি ও ইন্দেরহাট ঘাট থেকে কাঁচা মালের পাশাপাশি বিখ্যাত ক্রিকেটের ব্যাট, নানা জাতের চারা কলম, পাপোশ, ঝাড়ু প্রভৃতি পণ্য সহজেই সারা দেশে সরবরাহ করা হতো। বিকল্প রুট বা সড়কপথ ব্যবহারের ফলে অধিক ভাড়া গুনতে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকরা মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এই রুটের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ব্যস্ত ঘাটের অন্যতম শিকারপুর। অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রতিদিন ২ থেকে ৩ টি লঞ্চের বিশাল যাত্রী ও মালামালের অধিকাংশ এখান থেকেই ওঠানামা হতো। স্থানীয়দের মতে, আগে ভান্ডারিয়া থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চ ঘাটে ভিড়লে যাত্রী, হকার ও ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে পুরো ঘাট এলাকা মুখরিত থাকত। আজ সে রূপ নেই; লঞ্চ ঘাটগুলো এখন যাত্রীহীন, জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
নিয়মিত সেবা চালু না রাখায় যাত্রীরা বিকল্প উপায়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বলে মনে করেন অভিজ্ঞ যাত্রীরা। তবে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সর্বসাধারণের দাবি, সুবিশাল আকৃতির লঞ্চের পরিবর্তে মালিকপক্ষ যদি কম ড্রাফটের ছোট ডাইমেনশনের অন্তত একটি লঞ্চ প্রতিদিন নিয়মিতভাবে চালু রাখে, তবে মালামাল পরিবহনের গতি ফিরে আসবে এবং ধীরে ধীরে নিয়মিত যাত্রী সংকটাবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
নৌপথ বাঁচিয়ে রাখা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রান্তিক এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার স্বার্থে নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও লঞ্চ মালিকদের যৌথ উদ্যোগে অবিলম্বে অন্তত একটি নিয়মিত লঞ্চ চালুর আকুল আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।

