ঢাকাWednesday , 30 September 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পানির বুকে ভাসমান সবুজের চাষ: বদলাচ্ছে বানারীপাড়ার কৃষকের জীবন

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৪১

​মাইদুল ইসলাম শফিক, বানারীপাড়া :: বর্ষা এলেই পানিতে ডুবে যায় মাঠ-ঘাট, ফসলি জমি ও বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও কোমড় সমান পানি, কোথাও আবার জলবদ্ধতার কারণে মাসের পর মাস চাষাবাদ বন্ধ থাকে। কিন্তু প্রকৃতির এই প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি ও ইলুহার ইউনিয়নের কৃষকেরা। পানির বুকেই কচুরিপানা দিয়ে ভাসমান ‘ধাপ’ তৈরি করে তারা ফলাচ্ছেন নানা ধরনের শাক-সবজি ও চারা।

​স্থানীয়ভাবে ‘ভাসমান ধাপ’ নামে পরিচিত এই চাষাবাদ পদ্ধতিটি মূলত বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থা। বর্ষাকালে জলবদ্ধ ও নিচু জমি যখন প্রচলিত চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তখন কচুরিপানা, জলজ উদ্ভিদ ও জৈব উপকরণ একত্রে স্তূপ করে এই ভাসমান ধাপ তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে এর ওপর জৈব উপাদান ও মাটির সংমিশ্রণে চাষের উপযোগী ‘বেড’ বা তলা তৈরি করে শুরু হয় লালশাক, পালংশাক, লাউ, মিষ্টি কুমড়াসহ নানা রকমের শাক-সবজি ও চারা উৎপাদন।

​বিশারকন্দি ও ইলুহারের জলাভূমিতে বর্ষার পানির ওপর সারি সারি ভাসমান ধাপ দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পানির বুকে গড়ে উঠেছে এক একটি ছোট সবুজ বাগান।

​স্থানীয় কৃষক রাকিব জানান, “বর্ষায় জমিতে পানি উঠলে ধান বা অন্যান্য ফসল করার সুযোগ থাকে না। তখন ভাসমান ধাপই আমাদের একমাত্র ভরসা। নিজেদের শ্রম আর বিনামূল্যে পাওয়া স্থানীয় উপাদান দিয়ে এটি তৈরি করা যায় বলে খরচও অনেক কম।”

​অন্য আরেক কৃষক জামাল মিয়া বলেন, “ধাপে উৎপাদিত শাক-সবজি ও চারা পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে বাজারে তাজা সবজির চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দামও মিলছে।”

​তবে কৃষকদের অভিমত, এ পদ্ধতিতে পরিচর্যা ও শ্রমে কিছুটা বাড়তি কষ্ট রয়েছে। ভাসমান ধাপে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত মানের বীজ, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা গেলে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া সহজে বাজারজাতকরণের সুযোগ পেলে তারা আরও লাভবান হতে পারবেন।

​এ বিষয়ে বানারীপাড়া উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা  সিংহ জানান, “বিশারকান্দিতে ভাসমান শস্য ও চারা চাষ একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থা। এটাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। এই চাষের সাথে জড়িত কৃষকদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। যাতে তারা কোনো সমস্যার মুখোমুখি না হন, সেজন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

​কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিবৃষ্টির কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ভাসমান চাষের মতো ‘অভিযোজনভিত্তিক’ কৃষি পদ্ধতি জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

​সঠিক পরিকল্পনা, উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণ সুবিধা দেওয়া গেলে বানারীপাড়ার এই ভাসমান সবজি বিপ্লব পুরো দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হতে পারে।