
সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) :: প্রত্যন্ত গ্রামে জ্ঞানচর্চার আলো ছড়িয়ে আসছে প্রায় ২৫ বছর ধরে। গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্যসহ নানা বিষয়ের বইয়ে সমৃদ্ধ পাঠাগারটি এখন শুধু বই পড়ার স্থান নয়, স্থানীয় শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। বাবুগঞ্জের কৃতী সন্তান সাবেক বিচারপতি ও সাবেক স্পিকার মরহুম আব্দুল জব্বার খানের স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত এই পাঠাগারটি দীর্ঘদিন ধরে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের ভূতেরদিয়া স্টিমার ঘাট বাজারসংলগ্ন এলাকায় ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্পিকার আ. জব্বার খান স্মৃতি পাবলিক লাইব্রেরি। ২০১৩ সালে পাঠাগারটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধন লাভ করে।
বাবুগঞ্জের এই কৃতী ব্যক্তিত্বের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সমাজসেবক নুরুল ইসলাম মানিক পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। ‘পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে অন্ধকারে রই’, এই স্লোগানকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
পাঠাগার কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে এখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন খ্যাতনামা লেখকের পাঁচ হাজারের বেশি বই রয়েছে। গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ের এসব বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন স্থানীয় শিক্ষার্থী, তরুণ ও বইপ্রেমীরা।
ডিজিটাল যুগে শিশু-কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশ যখন মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত, তখন গ্রামীণ জনপদে বই পড়ার পরিবেশ ধরে রাখতে পাঠাগারটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার যেমন প্রয়োজন, তেমনি বই পড়ার অভ্যাসও ধরে রাখা জরুরি। সেই জায়গায় পাঠাগারটি প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীদের জন্য বিকল্প জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি করছে।
পাঠাগারে বসে বই পড়ার পাশাপাশি সদস্যরা বই বাড়িতে নিয়েও পড়ার সুযোগ পান। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। স্থানীয় যুবসমাজকে জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও পাঠাগারটি ভূমিকা রেখে আসছে।
তবে দীর্ঘদিনের এই প্রতিষ্ঠানটির ভবন নিয়ে রয়েছে কিছুটা উদ্বেগ। পাঠাগারের দুইতলা ভবনের পাশেই রয়েছে একটি খাল। খালের অবস্থানের কারণে ভবনের পাশের মাটি ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত বা সরে গেলে স্থাপনাটি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এ কারণে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই ভবনের পাশের অংশ সুরক্ষিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। পাঠাগার কর্তৃপক্ষের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী গাইডওয়াল নির্মাণ, খালের পাড় সংরক্ষণ, মাটি ভরাট কিংবা অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবনটি সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। এজন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কারিগরি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল ইসলাম মানিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পাঠাগারটি এলাকার মানুষের বই পড়া ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ করে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে খালের কারণে ভবনটি কোনো ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে, সেজন্য আগাম ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সরকারি সহযোগিতা পেলে পাঠাগারটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।
নিয়মিত পাঠক আরাফাত হোসেন মৃধা বলেন, অজপাড়াগাঁয়ে এমন একটি পাঠাগার এলাকার জন্য বড় সম্পদ। মোবাইল ফোনের অপব্যবহার থেকে তরুণদের দূরে রাখতে বই পড়ার পরিবেশ আরও সম্প্রসারিত করা দরকার। পাঠাগারের ভবন ও পরিবেশ সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
পাঠাগারের উপদেষ্টা ও সাবেক সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান (এমপি) বলেন, একটি গ্রামীণ পাঠাগার শুধু বই রাখার জায়গা নয়; এটি একটি এলাকার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। দীর্ঘদিনের এই প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, পাঠাগারটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জ্ঞানচর্চায় ভূমিকা রাখছে। ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

