
মজিবর রহমান নাহিদ :: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো বরিশাল সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ১৩ জুলাই (সোমবার) তার এই সফরকে ঘিরে ইতোমধ্যে বরিশালজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোও সফরকে সফল করতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে এই সফরকে শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশা বাস্তবায়নের সম্ভাবনাময় একটি অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক, বরিশাল-ভোলা সেতু, বরিশালে গ্যাস সরবরাহ, রেল সংযোগ, পায়রা সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের মতো দীর্ঘদিনের দাবিগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ এর প্রকাশিত সফরসূচি অনুযায়ী, ১৩ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টায় বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নে নবখননকৃত সরিকল-বাটাজোর খালের পাশে আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টায় বরিশাল নগরীর ত্রিশ গোডাউন বধ্যভূমি-সংলগ্ন সাগরদী খালের পাশে দ্বিতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন।
এরপর সার্কিট হাউসে স্বল্প সময়ের বিরতি শেষে বিকেল ৩টায় বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার।
সফর ঘিরে জোর প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বরিশাল নগরী ও গৌরনদী এলাকায় নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল, অনুষ্ঠানস্থল প্রস্তুতিসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়নের বার্তা ছড়িয়ে দিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে এবারের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যাতে সফরের প্রতিটি কর্মসূচি নির্বিঘ্ন, সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়।
নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ
প্রধানমন্ত্রীর বরিশাল সফরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তৃণমূল পর্যায়ের বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে অসংখ্য পোস্ট, ব্যানার ও শুভেচ্ছাবার্তা প্রকাশ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নগরীর বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় প্রশাসন এবং বিএনপির পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও দলীয় নেতারা দফায় দফায় সফরস্থল পরিদর্শন করছেন।
প্রশাসনের বক্তব্য
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১৩ জুলাই সকালে ঢাকা থেকে সড়কপথে বরিশালের উদ্দেশে রওনা হবেন। দিনব্যাপী তিনি গৌরনদী ও বরিশাল সদর এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সফরকে ঘিরে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিএনপির প্রত্যাশা
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এবং বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বরিশাল সফরকে ঘিরে দলীয় নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে সফরের অধিকাংশ প্রস্তুতি শেষ হয়েছে এবং বরিশালবাসী তাকে স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মীর জাহিদুল কবির জাহিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বরিশাল সফর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুয়াকাটা-বরিশাল-ভাঙ্গা ছয় লেন সড়ক, বরিশাল-ভোলা সেতু, বরিশালে গ্যাস সরবরাহ, রেললাইন এবং ইপিজেড প্রতিষ্ঠাসহ বহুদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে এই সফর ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা করছেন।
উন্নয়নের নতুন প্রত্যাশা
স্থানীয় সুশীল সমাজ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর সফর দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে নতুন গতি আনতে পারে। বিশেষ করে বরিশালকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে যেসব মেগা প্রকল্প পরিকল্পনায় রয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাদের মতে, ভাঙ্গা-বরিশাল-কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক, বরিশাল-ভোলা সেতু, ভোলার গ্যাস বরিশালে সরবরাহ, রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি নতুন মাত্রা পাবে।
নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ
শুক্রবার সন্ধ্যায় গৌরনদী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে গৌরনদী-আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি সভা চলাকালে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের মোবাইল ফোনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কথা বলেন।
ফোনালাপে তিনি উপস্থিত নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর নেন এবং বরিশালবাসীর প্রতি শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছাবার্তা পেয়ে সভায় উপস্থিত নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
এ সময় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বরিশাল সফর বরিশালবাসীর জন্য একটি গৌরবের মুহূর্ত। তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতি মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নের রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দেশের উন্নয়ন এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে।
প্রথম সফর ঘিরে আশাবাদ
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হলে আগামী ১৩ জুলাই উৎসবমুখর পরিবেশে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করবে বরিশালবাসী। রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই সফরকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশাগুলো বাস্তবায়নের পথে এই সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ বরিশাল সফর করেছিলেন তারেক রহমান। সে সময় নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যান (বেলস পার্ক) মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি। সরকার গঠনের পর এটিই তার প্রথম বরিশাল সফর।

