ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৮ জুন ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে অটোর দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ নগরবাসী, সিটি বাস ফেরানোর দাবি

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুন ১৮, ২০২৬ ১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬৮

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশাল নগরীতে সিটি বাস সার্ভিস বন্ধ হওয়ার পর থ্রি-হুইলারের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, লাগামহীন ভাড়া বৃদ্ধি এবং রুট অরাজকতায় জিম্মি লাখ লাখ নগরবাসী। জনভোগান্তি, নগর অর্থনীতির ওপর মারাত্মক আঘাত, চালক-যাত্রী দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনের রহস্যজনক উদাসীনতার আড়ালে থাকা প্রকৃত সত্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত অনুসন্ধানী রিপোর্ট।

এক জিম্মি নগরীর প্রতিদিনের গল্প
ক্লান্ত দুপুর কিংবা ব্যস্ত সকাল—বরিশাল নগরীর চৌমাথা, নথুল্লাবাদ কিংবা রূপাতলী বাস টার্মিনালের মোড়ে দাঁড়ালে একটা দৃশ্য নিত্যদিনের। তা হলো সাধারণ মানুষের তীব্র আকুতি, ক্ষোভ আর চরম অসহায়ত্ব। একটি লড়ঝড়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিংবা মাহিন্দ্রার সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র ১০ টাকার ভাড়ার জন্য রিকশাচালকের সাথে তর্কে লিপ্ত হচ্ছেন মধ্যবিত্ত কোনো চাকরিজীবী, কিংবা নিজের টিফিনের টাকা বাঁচানোর চেষ্টায় থাকা একজন কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী। এই দৃশ্য শুধু সামান্য কয়েকটি টাকার দ্বন্দ্ব নয়; এটি মূলত একটি পুরো বিভাগীয় শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার পঙ্গুত্ব এবং সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক নির্মম দলিল।

রূপাতলী থেকে লঞ্চঘাট, কিংবা নথুল্লাবাদ থেকে সাগরদী—প্রতিটি রুটেই আজ অদৃশ্য এক সিন্ডিকেটের কালো ছায়া। যেখানে আইনের শাসন ম্রিয়মাণ, আর সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি দশাটাই একমাত্র নির্মম বাস্তবতা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই সড়কে যাতায়াত করতে গিয়ে কেবল অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং মানসিকভাবেও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। বরিশাল নগরীর এই পরিবহন সংকট আজ আর কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, এটি এক সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।

 

নগরীর বর্তমান পরিবহন কাঠামো: একটি বিশৃঙ্খল ত্রি-স্তরীয় গোলকধাঁধা
একটি পরিকল্পিত আধুনিক শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বরিশাল শহরের বর্তমান পরিবহন কাঠামো সম্পূর্ণ বিপরীত এবং চরম সমন্বয়হীন। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি মাঝারি বা বড় আকারের শহরের গণপরিবহনের প্রধান অংশ হওয়া উচিত গণ-বাসভিত্তিক ব্যবস্থা। কিন্তু বরিশালে সেই চাকা অনেক আগেই উল্টো ঘুরতে শুরু করেছে। বর্তমানে নগরীর পরিবহন ব্যবস্থা মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে:

প্রথম স্তর (ব্যক্তিগত ও সীমিত প্রাইভেট যানবাহন): এই স্তরে রয়েছে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল এবং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কিছু যানবাহন। যদিও এদের সংখ্যা সীমিত, তবুও পিক-আওয়ারে প্রধান সড়কগুলোর একটি বড় অংশ এরা দখল করে রাখে।
দ্বিতীয় স্তর (ব্যাটারিচালিত অটো ও সিএনজি): এটিই বর্তমানে বরিশালের গণপরিবহনের মূল চালিকাশক্তি বা “লাইফলাইন”। সিটি বাস না থাকায় পুরো শহরের সিংহভাগ যাত্রী এই স্তরের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
তৃতীয় স্তর (অনিয়ন্ত্রিত প্যাডেল রিকশা ও স্থানীয় ছোট যানবাহন): গলিপথ এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত এই স্তরের যানবাহনগুলো যখন প্রধান সড়কে উঠে আসে, তখন বিশৃঙ্খলা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই তিন স্তরের মধ্যে প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নেই। একই সরু রুটে ধীরগতির রিকশা এবং দ্রুতগতির মাহিন্দ্রা একসাথে চলাচল করার ফলে পুরো শহরের সড়ক ব্যবস্থা একটি স্থায়ী গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।

সিটি বাস সার্ভিসের সুবর্ণ অতীত এবং ধাপে ধাপে পতনের ইতিহাস
বরিশাল নগরীর বর্তমান গণপরিবহন সংকট ও ভাড়া অস্থিরতা বোঝার জন্য এর অতীত ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি। নগরবাসীর একটি বড় অংশ এবং প্রবীণ নাগরিকদের মতে, সিটি বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই মূলত এই শহরের পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত পতন শুরু হয়। একসময় নির্দিষ্ট রুটে বাস চলাচল করায় নগরবাসী বেশ স্বস্তিতে ছিলেন।

জনপ্রিয়তার মূল কারণগুলো ছিল: নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল রুট, তুলনামূলক সাশ্রয়ী ভাড়া, বিপুল যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা এবং নিরাপদ যাতায়াত। নথুল্লাবাদ, রূপাতলী এবং লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট রুটে বাস চলাচল করায় যাত্রীরা আগে থেকেই তাদের গন্তব্য ও সময় নির্ধারণ করতে পারতেন। সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এটি ছিল একমাত্র পকেট-বান্ধব যাতায়াত মাধ্যম।

ধাপে ধাপে বন্ধ হয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ: পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক পরিবর্তন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রুট ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা এবং স্থানীয় কিছু গোষ্ঠীর নানামুখী চাপের কারণে সিটি বাস সার্ভিস ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবহন খাতে নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত এই সেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সিটি বাস বন্ধ হওয়া ছিল শুধুমাত্র একটি সার্ভিস বন্ধ হওয়া নয়, বরং একটি পুরো সুশৃঙ্খল পরিবহন কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক মৃত্যু। এর ফলে যাত্রী সাধারণ বিকল্পহীনভাবে ছোট যানবাহনের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন।

 

থ্রি-হুইলারের অনিরুদ্ধ গ্রাস ও রুট ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভাঙন
সিটি বাস উঠে যাওয়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণের নামে নগরীতে নামানো হয় হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি এবং মাহিন্দ্রা। পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই থ্রি-হুইলারের অনিরুদ্ধ বিস্তার এখন পুরো শহরের সড়ক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

বর্তমানে বরিশালের রুট ব্যবস্থার বাস্তবতা চরম উদ্বেগজনক। একটি সুসংগঠিত শহরে প্রতিটি গণপরিবহনের নির্দিষ্ট রুট এবং সময়সূচি থাকে। কিন্তু বরিশালে এখন রুট ব্যবস্থার কোনো কার্যকারিতা নেই। একই রুটে একাধিক ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। চালকেরা কোনো সময়সূচি মানেন না; বরং যাত্রী চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তারা ইচ্ছামতো রুট পরিবর্তন করেন। স্টপেজ না মেনে যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বরিশাল শহরের জনসংখ্যার অনুপাতে যতটুকু থ্রি-হুইলার প্রয়োজন, বর্তমানে চলাচল করছে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

 

ভাড়া সিন্ডিকেট বিতর্ক ও চালক-যাত্রী দ্বন্দ্বের মনস্তত্ত্ব
বরিশাল নগরীর পরিবহন খাতের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হলো “ভাড়া সিন্ডিকেট”। যদিও পরিবহন মালিক এবং চালক সংগঠনগুলো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব সবসময় অস্বীকার করে আসছে, তবে সাধারণ যাত্রীদের অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলে। নগরের প্রতিটি রুটে ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ কাজ করে। কোনো ধরনের সরকারি প্রজ্ঞাপন বা প্রশাসনের লিখিত অনুমতি ছাড়াই হঠাৎ করে বিভিন্ন রুটে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

“প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় ভাড়া নিয়ে চালকের সাথে তর্ক করতে হয়। কোনোদিন ১০ টাকা, কোনোদিন ১৫ টাকা। কোনো নির্দিষ্ট চার্ট নেই। আমরা কি সাধারণ মানুষ নাকি জিম্মি ?”—কাউনিয়া এলাকার একজন নিয়মিত যাত্রী

এই আস্থার সংকটের কারণে প্রতিদিন সড়কে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে ছোট ছোট বাকবিতণ্ডা থেকে শুরু করে বড় ধরনের হাতাহাতি বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ভাড়া নির্ধারণের কোনো কেন্দ্রীয় ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো কার্যকর না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।

 

নগর অর্থনীতি ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর মারাত্মক চাপ
পরিবহন খাতের এই অস্থিরতা এখন আর কেবল যাতায়াত খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি আঘাত হানছে বরিশাল নগরীর সামগ্রিক অর্থনীতি এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।

নিত্যপণ্যের পরিবহন খরচ বৃদ্ধি: ছোট যানবাহনের অতিরিক্ত ভাড়া এবং পরিবহনের অব্যবস্থাপনার কারণে পাইকারি বাজার (যেমন পোর্ট রোড) থেকে খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছানোর খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এই বর্ধিত পরিবহন ব্যয়ের দায় শেষ পর্যন্ত চাপছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। ফলে বরিশালের খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে চড়া। সাধারণ চাকরিজীবী, দিনমজুর এবং নিম্নআয়ের মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে যাতায়াত খরচে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এই লাগামহীন ভাড়া এক বড় মানসিক ও আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

চালকদের অর্থনৈতিক সমীকরণ: একটি অনানুষ্ঠানিক বাজারের ভেতরের চিত্র
অনুসন্ধানের স্বার্থে শুধুমাত্র যাত্রীদের অভিযোগই নয়, বরং চালকদের বাস্তব অর্থনৈতিক চাপ এবং তাদের পরিচালন ব্যয় বিশ্লেষণ করাও অত্যন্ত জরুরি। থ্রি-হুইলার খাতটি বর্তমানে একটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক বাজার তৈরি করেছে। চালক ও যাত্রী—উভয় পক্ষের দাবি ও বাস্তবতার একটি তুলনামূলক অর্থনৈতিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

খাত বা বিষয় চালক ও মালিক পক্ষের যুক্তি যাত্রী সাধারণের অভিযোগ ও বাস্তব চিত্র
পরিচালন ও বিদ্যুৎ ব্যয় সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ খরচ এবং নতুন ব্যাটারির দাম ব্যাপক বেড়েছে। পরিচালন ব্যয় বাড়লেও ভাড়ার হার তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বাড়ানো হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সড়কের বেহাল দশা এবং অতিরিক্ত যানজটের কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়, যা মেরামত করা ব্যয়বহুল। যন্ত্রাংশের দোহাই দিয়ে প্রতিদিন যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ উসুল করা হচ্ছে।
কিস্তি ও ঋণের চাপ চড়া সুদের কিস্তি এবং মহাজনের দৈনিক জমার টাকা পরিশোধের পর চালকের নিজের সংসার চালানো কঠিন। চালক বা মালিকের ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা সাধারণ যাত্রীদের ওপর চাপানো সম্পূর্ণ অন্যায়।
ভারা নির্ধারণের নিয়ম যাত্রী সংখ্যা এবং সময়ের ওপর ভিত্তি করে মুক্ত বাজারের নিয়মে ভাড়া নির্ধারিত হয়। কোনো অনুমোদিত তালিকা না থাকায় একেক যাত্রীর কাছ থেকে একেক রকম ভাড়া নেওয়া হয়।