ঢাকাThursday , 5 November 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে দরপত্র বাতিলের পরও কোথাও উচ্ছেদ অভিযান, কোথাও চলছে ভরাটের মহোৎসব!

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬২

রাহাত রাব্বি :: বরিশাল নগরীতে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের দরপত্র বাতিলের পরও থেমে নেই বালু ভরাটের কার্যক্রম। একদিকে দরপত্র বাতিলের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ড্রেজারের পাইপ উচ্ছেদ করছে কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুকুর, জলাশয় ও নিচু জমি ভরাটে ড্রেজারের পাইপ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এতে নগরীর পরিবেশ, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বরিশাল নগরীর ২২ নম্বর ওয়ার্ডের মদিনা মসজিদ সংলগ্ন তালুকদার বাড়ির মোড় এবং জিয়া সড়কের বাংলালিংক টাওয়ার এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজারের পাইপ স্থাপন ও বালু উত্তোলনের অভিযোগে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে কর্তৃপক্ষ।

উচ্ছেদ শাখা প্রধান মো. লকিতুল্লাহ্ সিকদারের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অবৈধভাবে স্থাপিত ড্রেজারের পাইপ জব্দ ও অপসারণ করেন।

অভিযান শেষে উচ্ছেদ শাখা প্রধান মো. লকিতুল্লাহ্ সিকদার জানান, পরিবেশ রক্ষা এবং নগরীর স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে দরপত্র বাতিলের আদেশ অমান্য করে কোথাও ড্রেজারের পাইপ ফেলে রাখা কিংবা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ধরনের উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সচেতন নাগরিকরা। তবে নগরীর কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পুরো নগরীতে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন ও ভরাট কার্যক্রমের ওপর সমানভাবে নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

উচ্ছেদ অভিযানের পরও বিভিন্ন এলাকায় বালু ভরাটের অভিযোগ

অন্যদিকে দরপত্র বাতিলের পরও বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুকুর, জলাশয় ও নিচু জমি ভরাটের কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, বরিশাল সিটি করপোরেশন ড্রেজারের মাধ্যমে নগরীতে বালু সরবরাহ ও ভরাটের দরপত্র বাতিল করলেও বাস্তবে বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ফেলার কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। তাদের অভিযোগ, একদিকে উচ্ছেদ অভিযান চলছে, অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে অনেকটা প্রকাশ্যেই চলছে বালু ভরাট।

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ড্রেজারের পাইপের মাধ্যমে বালু ফেলার কার্যক্রমের চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে চৌমাথা, সোনামিয়ার পুল এলাকা থেকে নতুনহাট, গাস্টারবাইন ও কালিজিরা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার লাইনের পাইপ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ভরাটের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নগরীর জলাধার রক্ষায় নজরদারি কতটা কার্যকর?

পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে পুকুর, জলাশয় ও নিচু জমি বালু দিয়ে ভরাট করা হলে নগরীর প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় শুধু পাইপ উচ্ছেদ করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; দরপত্র বাতিলের নির্দেশনা বাস্তবায়নে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত তদারকি, অবৈধ বালু ভরাটের স্থান চিহ্নিতকরণ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

একই সঙ্গে যেসব এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ভরাট চলছে, সেসব কাজের অনুমোদন রয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট জমি ও জলাশয় ভরাটের ক্ষেত্রে আইনগত বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, “বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন ও সরবরাহের জন্য করা দরপত্রটি আমরা বাতিল করেছি। কিন্তু এরপরও কিছু ব্যক্তি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অবৈধভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নগরীর যেসব এলাকা থেকে এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনে অভিযোগ আসছে, সেসব স্থানে উচ্ছেদ শাখার মাধ্যমে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, নগরীর পরিবেশ, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি রোধে সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন সব ধরনের পাইপলাইন ও বালু সরবরাহের পাম্পিং ব্যবস্থা দ্রুত বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, সেসব কার্যক্রম বন্ধে পুলিশ প্রশাসনকেও আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন আরও বলেন, নদীভাঙন, পরিবেশদূষণ এবং নগরীর রাস্তাঘাটের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিয়েই ড্রেজিং ও বালু উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আমার পূর্ববর্তী প্রশাসক রাহান কাউসার স্যারের দায়িত্বকালীন সময়ে এক বছরের জন্য এ সংক্রান্ত দরপত্র দেওয়া হয়েছিল। সেই দরপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আমি তা বাতিল করেছি। কারণ, এ কার্যক্রমের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নগরীর সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামোর ক্ষতি হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, দরপত্র বাতিলের পরও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ভরাটের অভিযোগ থাকলে সেসব কার্যক্রম বন্ধে কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়? উচ্ছেদ অভিযান কি শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পুরো নগরীর জলাধার ও পরিবেশ রক্ষায় সমানভাবে কার্যকর হবে?