ঢাকাবুধবার , ৮ জুলাই ২০২৬

বরিশালে হকার উচ্ছেদের পর রেন্ট-এ-কারের দখলে বিবির পুকুরপাড়! নগরবাসীর প্রশ্ন তাহলে উচ্ছেদের সুফল কোথায়?

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুলাই ৮, ২০২৬ ১২:৫৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
১০

মো: আম্মার হোসেন আম্মান ::  বরিশাল নগরীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র বিবির পুকুরপাড় থেকে অবৈধ হকার ও ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদের পর এলাকাটি এখন অনেকটাই পরিচ্ছন্ন ও উন্মুক্ত পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) ধারাবাহিক অভিযানে বেলস পার্ক, বিবির পুকুরপাড়, চৌমাথা লেকসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় নগরবাসীর একাংশ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে উচ্ছেদের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিবির পুকুরপাড়ের একটি অংশ রেন্ট-এ-কার ব্যবসার যানবাহনের দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—হকারদের উচ্ছেদ করে যদি আবার অন্যভাবে জায়গা দখল হয়, তাহলে অভিযানের প্রকৃত সুফল কোথায়?

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিবির পুকুরপাড়ের সড়কের দুই পাশ থেকে অবৈধ দোকানপাট ও অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে দেওয়ার পর এলাকাটি অনেক বেশি খোলামেলা ও পরিচ্ছন্ন হয়েছে। আগে যেখানে ফুটপাতজুড়ে দোকান বসার কারণে পথচারীদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো, সেখানে এখন মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করছেন। বিকেলের দিকে পরিবার-পরিজন ও শিশুদের নিয়ে অনেকেই সেখানে সময় কাটাতে আসছেন।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, হকার উচ্ছেদের পর খুব বেশি সময় না যেতেই বিবির পুকুরপাড়ের কিছু অংশে রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানের গাড়ি নিয়মিত অবস্থান নিতে শুরু করেছে। এতে ফুটপাত ও সড়কের একটি অংশ আবারও কার্যত দখলের মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

নগরবাসীর প্রশ্ন, যদি শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো গোষ্ঠীই জায়গাটি দখল করে রাখে, তাহলে শুধুমাত্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের উচ্ছেদ করে তাদের জীবিকায় আঘাত করার যৌক্তিকতা কোথায়? অনেকের মতে, নগরীর সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি সরকারি জায়গা যেন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখলে না যায়, সে বিষয়েও সমানভাবে নজরদারি প্রয়োজন।

বিবির পুকুরপাড়ে ঘুরতে আসা নগরীর সদর রোড এলাকার আগরপুর রোডের বাসিন্দা  দেবরাজ দত্ত ডোনা বলেন, “আগে এখানে এসে শান্তিতে বসা বা হাঁটা কঠিন ছিল। চারদিকে হকার, চটপটি-ফুচকার দোকান এবং উচ্চ শব্দে পরিবেশ নষ্ট হয়ে যেত। এখন জায়গাটি অনেক পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক। আমরা পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারছি। তবে এই পরিবেশ যেন কোনোভাবেই আবার দখলের কারণে নষ্ট না হয়, সেটাই চাই।”

এদিকে, উচ্ছেদ হওয়া ভাসমান ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় অভিযান প্রয়োজন হলেও জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ করা মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল জেলা কমিটির সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, “ফুটপাত ও বিনোদনকেন্দ্র দখলমুক্ত করা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া এই উচ্ছেদ দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই দ্রুত পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় যে অভিযান পরিচালিত হয়েছে, তা যেন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয়। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যেন সরকারি জায়গা দখল করতে না পারে, সে বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, “বিবির পুকুরপাড়, বেলস পার্কসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনকেন্দ্রগুলো কোনোভাবেই পুনরায় দখল হতে দেওয়া হবে না। নগরবাসীকে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও নান্দনিক শহর উপহার দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি ভাসমান ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণের কাজ চলছে।”

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার জন্য শুধু উচ্ছেদ অভিযানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দখলমুক্ত স্থান নিয়মিত তদারকি, আইনের সমান প্রয়োগ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত পুনর্বাসন। অন্যথায় এক পক্ষকে সরিয়ে অন্য পক্ষের দখল প্রতিষ্ঠিত হলে নগরবাসীর প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না।

বর্তমানে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ফিরে পাওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি থাকলেও বিবির পুকুরপাড়ে রেন্ট-এ-কারের গাড়ি অবস্থান নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেদিকেই নজর সবার।