ঢাকাশনিবার , ১১ জুলাই ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বপ্নে বরিশাল এটা শুধু স্টেডিয়াম নয় দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা স্বপ্ন ও আবেগ

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুলাই ১১, ২০২৬ ৩:০১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
১১

মো: আম্মার হোসেন আম্মান :: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বপ্নে বরিশাল : এটা শুধু স্টেডিয়াম নয় দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা স্বপ্ন ও আবেগ ক্রীড়াপ্রেমী মানুষের জন্য এক আনন্দের বার্তা

বরিশালের স্টেডিয়ামের আধুনিকায়নের খবর নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষের জন্য এক আনন্দের বার্তা। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন বরিশালবাসী হিসেবে আমিও এই অগ্রযাত্রায় আশাবাদী। ভাগ্য সহায় হলে হয়তো একদিন নিজের শহরের গ্যালারিতে বসেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ উপভোগ করার সৌভাগ্য হবে।

তবে বাস্তবতা হলো, একটি স্টেডিয়ামের অবকাঠামোগত উন্নয়নই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের জন্য যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC)-এর স্বীকৃতি পেতে হলে মাঠের মান উন্নয়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শহরকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। মাঠ, সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন এবং নগর পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়, ম্যাচ অফিসিয়াল, সম্প্রচারক, ভিআইপি অতিথি ও বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। প্রয়োজন উন্নতমানের পাঁচ তারকা হোটেল, বিশ্বমানের রেস্তোরাঁ ও শেফ, আধুনিক জিমনেসিয়াম, সুইমিং পুল, চিকিৎসাসেবা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। দুঃখজনক হলেও সত্য, বরিশালে এসব অবকাঠামোর অনেকটাই এখনও অনুপস্থিত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘাটতি পূরণে দৃশ্যমান কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তেমন শোনা যাচ্ছে না।
যোগাযোগ ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক আয়োজনের অন্যতম প্রধান শর্ত। বরিশাল বিমানবন্দরকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের সুবিধাসম্পন্ন করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। উন্নত রানওয়ে, আধুনিক টার্মিনাল, পর্যাপ্ত ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা ছাড়া বড় কোনো ক্রীড়া আয়োজন সফলভাবে পরিচালনা করা কঠিন হবে।
স্টেডিয়ামের বাইরেও পুরো নগরীর চেহারা আন্তর্জাতিক মানের হওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ সম্প্রচারের সময় শুধু মাঠ নয়, আশপাশের পরিবেশও বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের সামনে উঠে আসে। সেই বাস্তবতায় কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী এলাকা, বিশেষ করে অগোছালো ও ঝুঁকিপূর্ণ বস্তি অঞ্চলগুলোর পুনর্বাসনের মাধ্যমে পরিকল্পিত সৌন্দর্যবর্ধন জরুরি। নদীর দুই তীরকে নান্দনিক ওয়াটারফ্রন্টে রূপান্তর, সবুজায়ন, আধুনিক আলোকসজ্জা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বরিশালের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য বিশ্ববাসীর সামনে নতুনভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ ও ‘রূপসী বাংলার নগরী’ হিসেবে বরিশালের যে পরিচিতি রয়েছে, সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। মাঠ ব্যবস্থাপনা, কিউরেটর, স্বেচ্ছাসেবক, নিরাপত্তাকর্মী, সম্প্রচার সহায়তা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের বড় টুর্নামেন্ট, বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) বা অন্যান্য উচ্চমানের প্রতিযোগিতা সফলভাবে আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণও দিতে হবে।
আজ বরিশালের মানুষ যে স্বপ্ন দেখছে, সেটি শুধু একটি আধুনিক স্টেডিয়ামের স্বপ্ন নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক মানের শহর গড়ে তোলার স্বপ্ন। তাই এখন প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, বাস্তবমুখী উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। শুধু কথার ফুলঝুরি কিংবা আবেগ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভেন্যু হওয়া সম্ভব নয়।

বরিশাল যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানচিত্রে স্থান করে নিতে চায়, তবে স্টেডিয়ামের আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিমানবন্দর, হোটেল, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, নগর পরিকল্পনা, নদীতীর উন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল তৈরির প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এটি শুধু একটি ক্রীড়া প্রকল্প নয়; এটি বরিশালের অর্থনীতি, পর্যটন, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি বদলে দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এখন সময় বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের। তাহলেই একদিন হয়তো বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের পদচারণায় মুখর হবে বরিশাল, আর গর্বভরে বলা যাবে— আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখন আমাদের শহরেও।