
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালের হিজলা উপজেলার ১নং হরিনাথপুর ইউনিয়নের পূর্বকান্দি গ্রামের গ্রাম পুলিশ সদস্য মোঃ রিপন কাজীর বিরুদ্ধে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত গ্রাম পুলিশকে চাকরি থেকে বরখাস্তের দাবিতে ভুক্তভোগী পরিবার প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৬ জুলাই পূর্বকান্দি গ্রামের অলিউদ্দিন কাজী ওরফে আলাউদ্দিনের ছেলে গ্রাম পুলিশ কাজী রিপন তার সহযোগীদের নিয়ে কাজী রফিকের ওপর হামলা চালায়। চাকরির কারণে ঢাকায় অবস্থানকালে তাদের উপরে এই ঘটনা ঘটে। এতে গুরুতর আহত হন কাজী রফিক। পরদিন ১৭ জুলাই আহতের ভাই সোহেল কাজী বাদী হয়ে ঢাকার কদমতলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
পরবর্তীতে মামলায় চার্জ গঠন হলে চার্জ গঠনের সইমোহর কপি সংযুক্ত করে সোহেল কাজী বরিশালের জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ২০২৩ সালের ২ মার্চ হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে পত্র ইস্যু করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্দেশনার পরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
পরবর্তীতে চলতি বছরের ২ মার্চ ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট পঞ্চম আদালত গ্রাম পুলিশ রিপন কাজীকে দোষী সাব্যস্ত করে এক বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। আদালতের রায়ের সইমোহর কপি সংগ্রহ করে ভুক্তভোগী কাজী রফিকের ভাই সোহেল কাজী গত ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ সচিব, বরিশালের জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং স্থানীয় সরকার সচিব বরাবর আবেদন করেন। আবেদনে তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত গ্রাম পুলিশ রিপন কাজীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
তবে অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষ হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। পরে সোহেল কাজী আইনজীবীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। কিন্তু নোটিশেরও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে দাবি তার।
সোহেল কাজী অভিযোগ করেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে অফিস সহকারী মোঃ হুমায়ুন কবির তাকে মৌখিকভাবে জানান, তারা এ বিষয়ে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারবেন না।
এদিকে বরিশালের জেলা প্রশাসকের কাছে পুনরায় আবেদন করা হলে তিনি আবারও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোঃ নুরুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আবেদনকারী।
আদালত সূত্র জানায়, দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও রিপন কাজী গ্রাম পুলিশ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা সরকারি চাকরি বিধিমালার পরিপন্থী। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আবেদনকারী সোহেল কাজীর আইনজীবী বলেন, বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি সরকারি দায়িত্বে বহাল থাকতে পারেন না। তারপরও রিপন কাজী বহাল রয়েছেন। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বরখাস্ত দাবি করছি।
হিজলা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব নিয়ে গত ২৪ মে সন্ধ্যায় আলাপকালে তিনি জানিয়েছিলেন, পরদিন ২৫ মে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তবে নির্ধারিত দিনে তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি।
এ বিষয়ে গত ২৫ মে বিকেল ৫ টার দিকে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করেন উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত ২৮ এপ্রিল আমি তদন্ত সংক্রান্ত কাগজ হাতে পেয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। এছাড়া বর্তমানে আমাদের ফ্যামিলি কার্ড সংক্রান্ত কাজের ব্যাপক ব্যস্ততা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আসন্ন ঈদের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে। এদিকে প্রতিশ্রুত সময়েও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

