ঢাকাMonday , 14 September 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফল-ফুল-শাকসবজি থেকে খাদ্যরং, বরিশালের জান্নাতুলের নতুন স্বপ্ন

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৩৯

মো: শাখাওয়াত হোসেন :: খাবারে রং আনতে কৃত্রিম খাদ্যরঙের ব্যবহার দীর্ঘদিনের প্রচলিত অভ্যাস। সেই প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে স্থানীয় ফল, ফুল ও শাকসবজি থেকে প্রাকৃতিক খাদ্যরং তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন বরিশালের নারী উদ্যোক্তা জান্নাতুল ফেরদৌস। অপরাজিতা, জবা, গাঁদা, ডালিম ফুল, গাজর, পালং শাক, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করছেন নানা রঙের খাদ্যরং। এসব রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে পিঠা, লাড্ডু, কেক, মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য।

বরিশাল নগরের কাউনিয়া বিসিক এলাকায় তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘জে-টেস্টি নেস্ট’-এ চলছে এ উদ্যোগের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। জান্নাতুল ফেরদৌস ফিমেল এন্টারপ্রেনার্স ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (FEDS)-এর সভাপতি। দীর্ঘদিন ধরে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করা এই উদ্যোক্তার লক্ষ্য, স্থানীয় কৃষিপণ্যকে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি এবং এর সঙ্গে আরও নারীদের সম্পৃক্ত করা।

জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, বিভিন্ন ফল, ফুল, শাকসবজি ও উদ্ভিদের অংশ থেকে নির্যাস বের করে তা প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্যরং তৈরি করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে তৈরি এসব রঙে কৃত্রিম রাসায়নিক ব্যবহার না করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রক্রিয়ায় চিনি ব্যবহার করা হয়। তবে তিনি জানান, এখনো পুরো কার্যক্রমটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং উৎপাদন ও সংরক্ষণপ্রক্রিয়া আরও উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে।

এই উদ্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংরক্ষণকাল। বর্তমানে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তৈরি রং ৩ থেকে ৪ দিন এবং ফ্রিজে রাখলে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করা যায় বলে জানান উদ্যোক্তা। এরপর ছত্রাক পড়া, গন্ধ ও গুণগত পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দেয়। ফলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য ও বাজারজাতযোগ্য খাদ্যরং তৈরিই এখন তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, স্থানীয় ফল, ফুল ও শাকসবজি থেকে প্রাকৃতিক খাদ্যরং তৈরির উদ্যোগটি ভালো ও সম্ভাবনাময়। এটি শুধু খাবারে রং দেওয়ার বিষয় নয়; উপযুক্ত কাঁচামাল ও সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা গেলে খাদ্যের গুণগত মান বাড়ানোরও সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রাকৃতিক খাদ্যরং দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো, প্যাকেজিং উপকরণ, কাঁচামালের ধরন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ—সবকিছুর প্রভাব এখানে বিবেচনা করতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে কয়েক দিন থেকে ধাপে ধাপে ৭ দিন, ১৫ দিন এবং আরও দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। তবে এর জন্য পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা ও মান যাচাই প্রয়োজন।

ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী আরও বলেন, বড় পরিসরে উৎপাদনে কাটিং মেশিন, ব্লাঞ্চিং মেশিন, ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং উন্নত প্যাকেজিং প্রযুক্তির প্রয়োজন হতে পারে। কোন কাঁচামাল থেকে কোন ধরনের রং সবচেয়ে স্থিতিশীল হয়, সংরক্ষণে রঙের পরিবর্তন কতটা হয় এবং পুষ্টিগুণ কতটা অক্ষুণ্ন থাকে—এসব বিষয়ও গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, ড্রাগন ফল থেকেও প্রাকৃতিক খাদ্যরং তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রত্যাশিত রং পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত সমাধান পাওয়া গেলে আরও বিভিন্ন স্থানীয় ফল ও উদ্ভিদ থেকে খাদ্যরং তৈরির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

শুধু নিজের উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্য নারী উদ্যোক্তাদেরও এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করছেন জান্নাতুল। তাঁর সঙ্গে বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ জন নারী উদ্যোক্তা বিভিন্নভাবে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের খাদ্যপণ্য ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। নারীদের দক্ষতা বাড়িয়ে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

জান্নাতুল ফেরদৌসের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথও দীর্ঘ। ২০০৬ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্লক-বাটিকের কাজ শুরু করেন তিনি। পরে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুরে আচার, জ্যাম-জেলি, বিস্কুট ও মসলা প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ২০২৫ সালে নারীদের আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্য নিয়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু করেন। এরপর ‘জে-টেস্টি নেস্ট’-এর মাধ্যমে খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন।

এ উদ্যোগে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহযোগিতাও রয়েছে। বরিশাল বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মাহাবুব আলম বলেন, স্থানীয় ফল, ফুল ও শাকসবজি থেকে প্রাকৃতিক খাদ্যরং তৈরি করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

তিনি বলেন, পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে যেতে হলে পণ্যের মান, নিরাপত্তা, সংরক্ষণকাল ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি বাজারজাতের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও মাননিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদও জান্নাতুল ফেরদৌসের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাঁর সামনে প্রাকৃতিক খাদ্যরং ব্যবহার করে তৈরি পিঠা, লাড্ডু ও কেক প্রদর্শন করা হয়। স্থানীয় কৃষিপণ্যকে মূল্য সংযোজন করে নতুন পণ্য তৈরির এই উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “আমি চাই আমাদের দেশের ফল, ফুল ও শাকসবজি থেকেই খাদ্যরং তৈরি হোক। এখনো এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। সংরক্ষণকাল বাড়ানো এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়া আরও সহজ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে কাজ করতে চাই। একই সঙ্গে আরও নারীকেও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে চাই।”

স্থানীয় কৃষিপণ্যকে কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক খাদ্যরং তৈরির এ উদ্যোগ এখনো গবেষণা ও পরীক্ষার পর্যায়ে। তবে এর মাধ্যমে স্থানীয় কাঁচামালের মূল্য সংযোজন, নারী উদ্যোক্তা তৈরি এবং ভবিষ্যতে কৃত্রিম খাদ্যরঙের বিকল্প পণ্য তৈরির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেটিই বরিশালের জান্নাতুল ফেরদৌসের উদ্যোগকে আলাদা করে তুলেছে।