
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি নাশকতা মামলা ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ককটেল ও হাতবোমা বিস্ফোরণ, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে করা মামলায় ২৪৮ জনকে আসামি করা হলেও, সেই তালিকায় চারজন মৃত ব্যক্তি, বিএনপির ছয়জন নেতা এবং একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত থাকায় মামলার গ্রহণযোগ্যতা ও তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী মহল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে মামলাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার বাদী অবশ্য দাবি করেছেন, সাক্ষীদের দেওয়া ভুল তথ্যের কারণে এসব অসঙ্গতি হয়ে থাকতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল মহানগরের সাবেক সমন্বয়ক মারজুক আব্দুল্লাহ।
(বাম থেকে) বরিশাল সিটির সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী, হাফিজুর রশিদ, রেজাউর রহমান ও আবুল ফারুক।
অভিযোগ আমলে নিয়ে আদালত বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালত সূত্র জানিয়েছে, মামলায় অস্ত্র আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহারে আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি বরিশাল মহানগর বিএনপির ছয়জন নেতার নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর মজিদা বোরহান, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা মো. ইউনুস, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জিয়াউল হক মাসুম, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হুমায়ন কবির, সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর রাশিদা পারভীন এবং সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর সেলিনা আক্তার।
বিএনপির নেতারা এসব নাম অন্তর্ভুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘‘তার মা মজিদা বোরহানকে কী কারণে আসামি করা হয়েছে, সেটি জানার জন্য বাদীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাননি।’’
বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবির বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে করা মামলায় বিএনপির নেতাদের নাম দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।’’
মামলার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, আসামির তালিকায় এমন চারজনের নাম রয়েছে, যারা কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন।
এজাহারে ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর, ১৯৮ নম্বর আসামি আবুল ফারুক, ২২৫ নম্বর আসামি হাফিজুর রশিদ এবং ১৯৫ নম্বর আসামি আলী হাওলাদারের নাম রয়েছে। অথচ স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, তারা ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন।
কিন্তু মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন মাসে সংঘটিত কথিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে তারাও অংশ নিয়েছিলেন।
এজাহার বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, অন্তত আটজন আওয়ামী লীগ নেতার নাম দুইবার করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর ইমরান মোল্লা, তারেক শাহ, ছাত্রলীগ নেতা আরিফুর রহমান শাকিল, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু, সাবেক চেয়ারম্যান কামাল হোসেন মোল্লা লিটন, সাবেক প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন, আওয়ামী লীগ নেতা মজিবর রহমান বাচ্চু এবং শেখর দাস।
একই ব্যক্তিকে একাধিকবার আসামি করার বিষয়টিও মামলার তথ্যগত নির্ভুলতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মামলার বাদী মারজুক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘‘সাক্ষীদের দেওয়া তথ্যে ভুল থাকলে সেটি তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তিনি দাবি করেন, তাকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে কেউ ভুল তথ্য দিয়ে থাকতে পারে।’’
বিএনপির কয়েকজন নেতা, যারা নাম প্রকাশ করতে চাননি, অভিযোগ করেন যে মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে। তারা এটিকে ‘‘মামলা বাণিজ্যর অংশ বলেও দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তারা কোনো নথিপত্র বা প্রমাণ প্রকাশ করেননি এবং এ বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
বরিশাল মহানগরের এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, মামলার এজাহারের অনুলিপি তখনও তার হাতে পৌঁছায়নি। ফলে মামলার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
অন্যদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, মামলায় যেসব ঘটনা, সময় ও আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটি বিষয় তদন্ত করে দেখা হবে। যদি কোনো অসঙ্গতি বা ভুল তথ্য পাওয়া যায়, তদন্ত প্রতিবেদনে তা যথাযথভাবে উল্লেখ করা হবে।
মামলাটি এখন তদন্তাধীন। ফলে এজাহারে উল্লিখিত অভিযোগ, আসামিদের সম্পৃক্ততা, মৃত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া কিংবা একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার থাকার কারণ, সবকিছুরই চূড়ান্ত মূল্যায়ন হবে তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
তবে মামলার এজাহারে দৃশ্যমান এসব অসঙ্গতি ইতোমধ্যেই বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

