ঢাকাWednesday , 2 September 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‎বরিশালের বাটনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ‎

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৪৩

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশাল সদর উপজেলার ২১ নম্বর বাটনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহারে অনিয়ম এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক শ্যামলী মজুমদারের ছত্রছায়ায় একটি শিক্ষক ‘সিন্ডিকেট’ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

‎অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়সূচি ও পাঠদানের কার্যক্রম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে বিদ্যালয়ে সকাল ৭টা থেকে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। শিক্ষক তমারানি বালার বিরুদ্ধে সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত প্রাইভেট পড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এ থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ ভাগাভাগি করা হয় বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

‎এদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অপচয়ের অভিযোগও উঠেছে বিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, ছুটির পরও অনেক সময় বিদ্যালয়ের ফ্যান, লাইট ও পানির মোটর চালু রেখে শিক্ষক-কর্মচারীরা চলে যান। ফলে রাতভর বিদ্যুৎ চলতে থাকে এবং পানির ট্যাংকি পূর্ণ হয়ে পানি অপচয় হয়। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও একটি সরকারি বিদ্যালয়ে এ ধরনের অপচয় দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা।

‎পরীক্ষা চলাকালীন দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগও রয়েছে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, পরীক্ষার সময় কোনো কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে দায়িত্ব পালন না করে লাইব্রেরিতে বসে আড্ডা দেন। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে বই দেখে পরীক্ষা দেয় এবং কেউ কেউ পরীক্ষার কক্ষের বাইরে খেলাধুলা করলেও তদারকির যথাযথ ব্যবস্থা থাকে না।

‎প্রধান শিক্ষক শ্যামলী মজুমদারের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন এবং নিজের ইচ্ছামতো বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করেন। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।

‎এছাড়া সরকারি শিক্ষক প্রিয়াঙ্কা সাহার বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে বিভিন্ন ধরনের সবজি আনতে বলার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক। কেউ এসব দিতে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিকভাবে মারধর এবং পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

‎বিদ্যালয়ে একই পরিবারের মা-মেয়ে শিক্ষকতা করছেন—এ বিষয়টিও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা তৈরি করেছে। তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেকটা পারিবারিক আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে লাইব্রেরিতে নিয়মিত ক্লাস না করে শিক্ষকরা আড্ডা দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

‎আরও অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের পিয়নের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ভাড়া দেওয়ার কাজ করার বিষয়েও। এ খাত থেকেও প্রধান শিক্ষক সুবিধা পান বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

‎সরকারি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ স্লিপের অর্থ বিভিন্ন ভাউচার তৈরি করে আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে প্রধান শিক্ষক শ্যামলী মজুমদারের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের যথাযথ হিসাব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

‎সম্প্রতি অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকরা বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে অফিস সময়ে অনুপস্থিত দেখতে পান। পরে তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসে যাওয়ার কথা জানান। তবে সাংবাদিকরা উপজেলা শিক্ষা অফিসে খোঁজ নিয়ে সে সময় প্রধান শিক্ষক সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানতে পারেন।

‎এ সময় শিক্ষক প্রিয়াঙ্কা সাহা সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণ করেন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। শিক্ষক তমারানি বালার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অসুস্থ থাকায় প্রধান শিক্ষক তাকে চলে যেতে বলেছেন বলে জানান।

‎অভিযোগগুলো সম্পর্কে স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের অবহিত করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের প্রশ্ন—একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিনের পর দিন এমন অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

‎অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষকদের উপস্থিতি, পরীক্ষার কার্যক্রম, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং স্লিপের অর্থসহ সব ধরনের আর্থিক লেনদেনের হিসাব নিরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

‎তাদের ভাষ্য, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ নেই। শিশুদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ের পরিবেশে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা জরুরি।

‎এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক শ্যামলী মজুমদারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।