ঢাকাSaturday , 29 August 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে নদীর পাড় ভরাট করে পাইলিং, দপদপিয়া ফেরিঘাটে বাউন্ডারি নির্মাণের অভিযোগ অপসোনিনের বিরুদ্ধে

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৪৭

নিজস্ব প্রতিবেদক :: প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই—একসময় এটি ছিল দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও বরিশাল নগরীর রূপাতলী দপদপিয়া ফেরিঘাট। প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও যানবাহনের যাতায়াতে ব্যস্ত থাকত ঘাট এলাকা। তবে ২০১১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু চালুর পর আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ফেরি চলাচল।

ফেরি চলাচল বন্ধ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা ঘাট ও আশপাশের সরকারি সম্পত্তি এবং নদীতীরবর্তী জমি নিয়ে শুরু হয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, এরই সুযোগে ঘাটসংলগ্ন নদীর পাড় ও সরকারি জমির একটি অংশ দখলের চেষ্টা চলছে। অভিযোগ উঠেছে, নদীর পাড় ভরাট করে পাইলিং স্থাপন করে নদীর ভেতর পর্যন্ত বাউন্ডারি নির্মাণ করছে বরিশালের শিল্পপ্রতিষ্ঠান অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড

সরেজমিনে ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীরবর্তী অংশে মাটি ফেলে ভরাট করার পাশাপাশি পাইলিংয়ের মাধ্যমে স্থাপনা তৈরির কাজ চলছে। নদীর স্বাভাবিক সীমানা থেকে ভেতরের দিকে নির্মাণকাজ এগিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন—নদীর জায়গা ভরাট করে এভাবে বাউন্ডারি নির্মাণের অনুমতি কে দিয়েছে এবং এর বৈধ কাগজপত্রই বা কী?

দখলে যাচ্ছে নদীর তীর ও সরকারি সম্পত্তি—স্থানীয়দের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে বন্ধ থাকা দপদপিয়া ফেরিঘাট ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিভিন্ন সময়ে জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। তাদের অভিযোগ, অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের দখলে থাকা জমির পরিমাণও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে।

স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, শুরুতে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটির কারখানা স্থাপন করা হলেও বর্তমানে এর দখলে থাকা জমির পরিমাণ অনেক বেশি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙন ও নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নবিত্ত মানুষের জমিও এই দখল প্রক্রিয়ার আওতায় পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক জমির মালিককে যথাযথ অর্থ পরিশোধ না করেই সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। কেউ কেউ আংশিক অর্থ পেলেও অনেকে এখনো জমির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অপসোনিন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘাট বন্ধ হলে নলছিটির মানুষের যোগাযোগে সংকটের আশঙ্কা

দপদপিয়া ফেরিঘাট এলাকায় এখনো স্থানীয় মানুষের নৌযাতায়াত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, নদীপথে নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের জন্য এই স্থানটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩৫ বছর ধরে ফেরিঘাট এলাকায় ব্যবসা করা এক ব্যবসায়ী বলেন,
“আমি ৩৫ বছর ধরে এই ফেরিঘাটে ব্যবসা করেছি। ফেরি বন্ধ হওয়ার পর আমরা আরও অসহায় হয়ে পড়েছি। এখন এখান থেকে নৌকা দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন। নদীর পাশ দিয়ে বাউন্ডারি দিয়ে পুরো এলাকা দখল করে নেওয়া হলে ভবিষ্যতে মানুষের নৌযাতায়াতও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।”

তার অভিযোগ, কোম্পানির কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কেউ কথা বললে দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হয়। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অনেকটা জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

‘লিজ নিলে কাগজপত্র দেখতে হবে’

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক কাজী মিজানুর রহমান বলেন,
“যদি তারা সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে থাকে এবং কাগজপত্র ঠিক থাকে, তাহলে বাউন্ডারি করতে পারে। তবে নদীর জায়গা, সরকারি সম্পত্তি বা লিজের জমির সীমানা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন। এটি দেখার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের। দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”

তিনি আরও বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কোনো জমি লিজ নিলেও সেখানে স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ ও জনসাধারণের চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।

সড়ক বিভাগের বক্তব্য

রূপাতলী ফেরিঘাট ও নদীতীরবর্তী জমি নিয়ে জানতে চাইলে বরিশাল সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম বলেন,
“রূপাতলী ফেরিঘাট ও নদীর জমি লিজ নেওয়ার জন্য অপসোনিন একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। অফিস খোলার পর কাগজপত্র দেখে বিস্তারিত বলতে পারব। আপনি অফিসে আসুন।”

তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, সংশ্লিষ্ট জমি লিজ দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা রয়েছে। তবে নদীর ভেতরে পাইলিং করে বাউন্ডারি নির্মাণের অনুমোদন বা নির্মাণকাজটি বৈধ কি না, সে বিষয়ে কাগজপত্র পর্যালোচনা না করে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

নদীতে বর্জ্য ফেলার অভিযোগও

স্থানীয়দের অভিযোগ, জমি দখল বা নদীর পাড় ভরাটের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নদীতে বর্জ্য ফেলার অভিযোগও রয়েছে। এতে নদীর পানি ও পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, বিষয়টি শুধু জমির মালিকানা বা দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত নৌপথের ভবিষ্যৎ নিয়েও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তদন্তের দাবি স্থানীয়দের

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা বলছেন, দপদপিয়া ফেরিঘাটের জমির মালিকানা, নদীর সীমানা, লিজের কাগজপত্র এবং বর্তমানে নির্মাণাধীন বাউন্ডারির অনুমোদন—সবকিছু প্রকাশ্যে এনে তদন্ত করা দরকার। একই সঙ্গে নদীর জায়গা ভরাট বা দখলের সত্যতা পাওয়া গেলে তা দ্রুত উচ্ছেদ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদিকে অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকারকে মুঠোফোনে মেসেজ পাঠিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

ফলে নদীর পাড় ভরাট করে পাইলিং ও বাউন্ডারি নির্মাণের অভিযোগের সত্যতা, জমির মালিকানা এবং নির্মাণকাজের অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।