ঢাকামঙ্গলবার , ২ জুন ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নাকের ডগায় মাদক ব্যবসা!

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুন ২, ২০২৬ ২:১৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
১২১

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশাল নগরীতে মাদকদ্রব্যের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে নগরীর ভাটিখানা এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একসময় বিচ্ছিন্নভাবে মাদক কেনাবেচার ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে ভাটিখানা ও এর আশপাশের এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয় এবং সেবন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এর ফলে এলাকার সামাজিক পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাটিখানার কয়েকটি প্রধান সড়ক, অলিগলি এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকার আশপাশে দিন-রাত প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে মাদক লেনদেন চলে। অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারিদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সক্রিয় থাকায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু নির্বাচনের বিষয়েও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে।

এলাকাবাসীর দাবি, মাদক ব্যবসার বিস্তারের সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মারামারি এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের মতে, এসব অপরাধের বড় একটি অংশের সঙ্গে মাদকসেবন ও মাদক ব্যবসার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

চিহ্নিত কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অনুসন্ধানে এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে ভাটিখানা ও এর আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকজন কথিত মাদক কারবারির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, কাজি বাড়ি এলাকার নিশাত, চন্দ্রোপাড়ার রাসেল, জোড় মসজিদ এলাকার খান বাবু ও অমি, রোকেয়া আজিম সড়কের রাজন, পান্থ সড়কের হাতকাটা নিজাম, মনির ও হালিম দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থেকে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এছাড়া ভাটিখানার শাওন ও হাসিব এবং নিউ ভাটিখানার শাহাদতের বিরুদ্ধেও এলাকায় সক্রিয়ভাবে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এসব ব্যক্তির মধ্যে কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও নানা কারণে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়নি। বিশেষ করে হাতকাটা নিজাম নামে পরিচিত একজন ব্যক্তি বহু বছর ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সংঘবদ্ধ চক্র ও কিশোরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাটিখানা এলাকায় শুধু কয়েকজন ব্যক্তি নয়, বরং একাধিক সংঘবদ্ধ মাদক চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্র নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, উঠতি বয়সী তরুণ ও কিশোরদের একটি অংশকে এসব চক্র নানা প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ডে যুক্ত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে সামাজিক নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। মাদকাসক্ত তরুণদের মাধ্যমে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

অসাধু যোগসাজশের অভিযোগ।

অনুসন্ধানে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, চিহ্নিত এক মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক অসাধু সদস্যের দীর্ঘদিনের সখ্যতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই যোগসাজশের সুযোগ নিয়ে ওই ব্যক্তি প্রকাশ্যে নয়, বরং আড়ালে থেকে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

অভিযানের আগাম তথ্য ফাঁসের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাটিখানার কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তাদের দাবি, অভিযানের আগাম তথ্য কোনো না কোনোভাবে সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না।
একজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রায়ই শুনি অভিযান হবে। কিন্তু অভিযান শুরুর আগেই অনেক সন্দেহভাজন ব্যক্তি এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পরে ছোটখাটো কয়েকজনকে আটক করা হলেও মূল কারবারিরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
আরেকজন অভিভাবক বলেন, “সবচেয়ে বেশি ভয় আমাদের সন্তানদের নিয়ে। এলাকায় মাদক এত সহজলভ্য হয়ে গেছে যে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আতঙ্কিত।”
সামাজিক অবক্ষয়ের শঙ্কা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকের বিস্তার শুধু অপরাধ বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে সামাজিক অবক্ষয়ও ত্বরান্বিত করছে। মাদকাসক্তির কারণে অনেক পরিবারে অশান্তি, আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক ভাঙনের ঘটনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ।
প্রশাসনের বক্তব্য

এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাদকবিরোধী অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া। নগরীর কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসা বা মাদকসেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তারা বলেন, “মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যে-ই হোক না কেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো পুলিশ সদস্য বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অসাধু যোগসাজশের অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।”

নগরবাসীর দাবি।

এদিকে নগরবাসী ভাটিখানা ও আশপাশের এলাকাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মাদক ব্যবসার বিস্তার রোধে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত অভিযান, মাদক কারবারিদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং কিশোর-তরুণদের সচেতন করতে সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।
স্থানীয়দের ভাষায়, “মাদকের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে প্রশাসন, পরিবার এবং সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।”