ঢাকাFriday , 6 November 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে ১১ দিনের মাথায় একই কাণ্ড, গভীররাতে ইউএনওর অ্যাকশন!

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৫১

আহমেদ বায়েজিদ, বরিশাল :: চার লাখ টাকা জরিমানা, প্রশাসনের অভিযান এবং বাল্কহেড-ড্রেজার জব্দ-কোনো কিছুতেই যেন থামানো যাচ্ছে না কীর্তনখোলা নদীর দপদপিয়া সেতুর নিচে বালু উত্তোলন। বারবার একই স্থানে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠছে চাঁদমারী এলাকার বাসিন্দা আল আমিনের বিরুদ্ধে। প্রশাসনের হাতে জব্দ হওয়ার পর জরিমানা দিয়ে মালিকের জিম্মায় ফিরে যাওয়া একই দুটি বাল্কহেড ও একটি ড্রেজার মাত্র ১১ দিনের মাথায় আবারও বালু উত্তোলনে ব্যবহারের অভিযোগে জব্দ হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, জরিমানা দিয়েই কি বারবার অবৈধ বালু উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে? নাকি কঠোর আইনি পদক্ষেপের অভাবে বালু উত্তোলনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন?

৫ নভেম্বর দিবাগত গভীর রাতে প্রায় ২টার দিকে দপদপিয়া সেতুর নিচে বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে অভিযান পরিচালনা করেন বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফরিদা সুলতানা। রাতের নীরবতা উপেক্ষা করে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বিসিজি স্টেশন বরিশাল দক্ষিণ জোনের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সরাসরি ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বালুবোঝাই দুটি বাল্কহেড ও একটি লোড ড্রেজার জব্দ করা হয়। এ সময় চারজনকে আটক করা হয়েছে। জব্দ করা ড্রেজারটির নাম রিফাজ জাহান ইকরা-১। প্রায় সাড়ে সাত হাজার ঘনফুট বালুবোঝাই বাল্কহেডটি হলো এম-১। অপরটি হলো এমবি জোবেদা।

আটক ব্যক্তিরা হলেন বাল্কহেড চালক বাচ্চু এবং শ্রমিক আব্দুল জলিল, মো. লিটন ও হুমায়ুন। অভিযানের সময় অন্য কয়েকজন শ্রমিক পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৫ নভেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে দপদপিয়া সেতুর নিচে বালু উত্তোলনের খবর পান ইউএনও ফরিদা সুলতানা। খবর পাওয়ার পর কালক্ষেপণ না করে কোস্টগার্ডের একটি দল নিয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে পৌঁছে চাঁদমারী এলাকার বাসিন্দা আল আমিনের মালিকানাধীন দুটি বাল্কহেড ও একটি লোড ড্রেজার দেখতে পান। প্রশাসন ও কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে চালকরা জলযানগুলো নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে কোস্টগার্ড সদস্যদের তৎপরতায় তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে বাল্কহেড ও ড্রেজারগুলো জব্দ এবং চারজনকে আটক করা হয়। ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, গত ২৬ অক্টোবরও একই স্থানে অভিযান চালিয়ে আল আমিনের মালিকানাধীন ওই দুটি বাল্কহেড ও একটি ড্রেজার জব্দ করেছিল প্রশাসন। সে সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে চার লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
তবে জরিমানা আদায়ের পর জব্দ করা বাল্কহেড ও ড্রেজারগুলো মালিক আল আমিনের জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল। এরপর মাত্র ১১ দিন যেতে না যেতেই ৫ নভেম্বর দিবাগত রাতে একই সরঞ্জাম আবারও দপদপিয়া সেতুর নিচে বালু উত্তোলনের সময় জব্দ হওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। এ ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, আগের অভিযানে জরিমানা আদায় করেও কেন বালু উত্তোলন বন্ধ করা গেল না? জব্দ করা সরঞ্জাম মালিকের জিম্মায় দেওয়ার পর সেগুলোর ব্যবহার পর্যবেক্ষণে কী ধরনের নজরদারি ছিল? জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেই যদি একই কাজে পুনরায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে বিদ্যমান অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে?

দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ২০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দপদপিয়া সেতু। সেতুর নিচে নিয়মিত ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ শুধু নদীসম্পদ লুণ্ঠনের বিষয় নয়, এটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে সেতুর পিলার ও ভিত্তির আশপাশের মাটি সরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে সেতুর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের অবকাশ রয়েছে। তাই বিষয়টি অবহেলা করার সুযোগ নেই। একই মালিকের বিরুদ্ধে বারবার বালু উত্তোলনের অভিযোগ এবং একই সরঞ্জাম পুনরায় জব্দ হওয়ার ঘটনা প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। শুধু জরিমানা আদায় করে অভিযান শেষ করলে এই প্রবণতা বন্ধ নাও হতে পারে। বরং সংশ্লিষ্ট মালিক, পরিচালনাকারী এবং অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে আগের অভিযানে জব্দ করা সরঞ্জাম কোন শর্তে মালিকের জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল, সেই শর্ত ভঙ্গ হয়েছে কি না এবং পুনরায় একই অপরাধে ব্যবহারের ঘটনায় মালিকের দায় কতটুকু-তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে ড্রেজারের বৈধ অনুমোদন, বালু উত্তোলনের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরঞ্জাম জব্দ, আদালতের মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফরিদা সুলতানার গভীর রাতের এই অভিযান নিঃসন্দেহে দায়িত্বশীল ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে অভিযান তখনই স্থায়ী সুফল বয়ে আনবে, যখন অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। দপদপিয়া সেতুর নিরাপত্তা, নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ এবং জনস্বার্থ রক্ষায় বালু উত্তোলনের এই অপতৎপরতা বন্ধে প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। এ ঘটনায় পুনরায় জব্দ করা বাল্কহেড ও ড্রেজারের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।