ঢাকাSunday , 1 November 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষা, বেনাপোলের আফিয়া মাসুমা পেল এ গ্রেড

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৪২
শার্শা উপজেলা  প্রতিনিধি :: বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল বেনাপোলের আফিয়া মাসুমা। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাবার মৃত্যুর শোক বুকে চেপে পরীক্ষার হলে বসেছিল সে। সেই কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়ে সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এ গ্রেড অর্জন করেছে মাসুমা। তার এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, যশোরের শার্শা উপজেলা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ গ্রেড পেয়েছে আফিয়া মাসুমা।
মাসুমা বেনাপোল পোর্ট থানার নামাজ গ্রামের প্রয়াত আব্দুস সামাদের ছোট মেয়ে। তার বাবা আব্দুস সামাদ (৬৫) ছিলেন বেনাপোলের মেসার্স তাজমহল ট্রান্সপোর্ট ও হাজী মুছা করিম অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী। তিনি একজন বিশিষ্ট আমদানিকারকও ছিলেন।
পরিবার ও কলেজ সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় বাড়িতে স্ট্রোকজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন আব্দুস সামাদ। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। রাতে তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরদিন সকালে চলছিল মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি। এমন শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্যেই বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যায় আফিয়া মাসুমা। বেনাপোল কলেজ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় তার পরীক্ষা।
পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফিরে বাবার দাফনে অংশ নেয় সে। মেয়ের পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে মরদেহ দাফনের সময়ও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাবার শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকার আকুতি জানিয়েই পরীক্ষার হলে গিয়েছিল মাসুমা। বাবাকে হারানোর গভীর শোক নিয়েই পরবর্তী পরীক্ষাগুলো শেষ করে সে।
ফলাফল প্রকাশের পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে মাসুমা বলে, বাবা সব সময় চাইতেন আমি ভালো ফলাফল করি। পরীক্ষার সময় বাবাকে হারানো আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত ছিল। কিন্তু বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। আমি আরও ভালো ফলাফল করতে পারতাম। পরীক্ষার খাতায় লিখতে গিয়ে বারবার মৃত বাবার মুখটা ভেসে আসছিল। বাবা বেঁচে থাকলে আমার এই ফলাফল দেখে খুব খুশি হতেন।
সে আরও জানায়, সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চায়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে যেন সবার মুখ উজ্জ্বল করতে পারে, সে জন্যও দোয়া কামনা করেছে।
শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হাসানউজ্জামান জানান, মাসুমা শুরু থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। সে ভালো ফলাফল করবে, এমন প্রত্যাশা শিক্ষকদের ছিল। পরীক্ষা চলাকালে বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে কলেজের সম্মান আরও উজ্জ্বল করেছে।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত জীবনের এত বড় শোককে জয় করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং এ গ্রেড অর্জন করা তার অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয়। তার ফলাফলে আমরা সবাই খুশি। বাবার মৃত্যুর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটলে সে জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারত বলে আমাদের বিশ্বাস। ভবিষ্যতেও মাসুমা সাফল্যের স্বাক্ষর রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।
শার্শা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাবাকে হারানো যে কারও জন্য অত্যন্ত কষ্টের। সেই শোক বুকে নিয়েও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাসুমার ভালো ফলাফল অর্জন অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। উপজেলা প্রশাসন এই মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তার পরিবার সহযোগিতা চাইলে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে।
বাবাকে হারানোর শোকের মধ্যেও শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ গ্রেড অর্জন করা আফিয়া মাসুমার এই সাফল্য শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।