ঢাকাFriday , 2 October 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে দলীয় পরিচয়ে নানান অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে নেতাকর্মীরা, শৃঙ্খলা ফেরাতে হার্ডলাইনে প্রধানমন্ত্রী

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৩৯

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নানান অনিয়মে জড়িয়ে পড়া নেতাকর্মীরা, শৃঙ্খলা ফেরাতে হার্ডলাইনে প্রধানমন্ত্রী।

 

ক্ষমতায় আসার পর দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল, হামলা, ভাঙচুর ও নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়া নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জানান দিয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তৃণমূলে দলীয় শৃঙ্খলা ফেরাতে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রস্তুতি চলছে।

 

এরই মধ্যে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এছাড়া এক রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি বিলুপ্ত এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কারের মতো ঘটনাও ঘটেছে।

দলীয় ও সরকারি সূত্র বলছে, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের ভেতরের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকে এখন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সরকার গঠনের পর দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ বাড়তে থাকায় দলের ভাবমর্যাদা নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের লাগাম টানতে তৃণমূল থেকে অভিযোগ সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।

সবশেষ মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করতে বলা হয় বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে স্পিকার তার পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন। পরে সংসদ সচিবালয় সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে।

তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে মিষ্টি বলেন, সংশ্লিষ্ট সমিতির সঙ্গে বর্তমানে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ছাড় দেওয়া হবে না।

এক রাতে তিন কমিটি বিলুপ্ত

দলীয় শৃঙ্খলা ফেরাতে সাংগঠনিক পর্যায়েও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বিএনপি। গত বুধবার রাতে ৫১ সদস্যের ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। আমিনুল হককে আহ্বায়ক ও মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে গঠিত কমিটির পরিবর্তে শিগগির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

একই রাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। এছাড়া বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির তিন নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। শ্রমিক দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও একই ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে।

সরকারও বিব্রত

বিএনপি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মীকে দলীয় বিশৃঙ্খলার দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সরকার গঠনের পরও দলের একটি অংশের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসছে। এতে সরকারের ভালো কাজগুলোও বিতর্কিত হচ্ছে বলে দলের নেতারা মনে করছেন।

সম্প্রতি সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর ও অবৈধ দখলের ঘটনায় সরকার দুঃখিত ও বিব্রত। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স আমার দেশকে বলেন, গুটিকয়েক ব্যক্তির অপরাধের দায় বিএনপি নেবে না। দলীয় আদর্শের বাইরে গিয়ে কেউ কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে কয়েকটি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। যারা সরকার ও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আইনশৃঙ্খলায় বিশেষ অভিযানের চিন্তা

সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযানের কথা ভাবছে সরকার। তবে এটি ২০০৪ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো কোনো অভিযান হবে কি নাÑসে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এরই মধ্যে দেশব্যাপী কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ অভিযান চলছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বারবার চাঁদাবাজি, জমি দখল, সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এসেছে, তাদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। তৃণমূল থেকে অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই শেষে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর দর্শনা পৌর যুবদলের সদস্য রাকিবুল হাসান ব্রাইটকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ মহানগর কৃষক দলের সদস্য সচিব সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সলকে পদ্মা অয়েল ডিপোর কর্মীদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এর আগে ২১ জুন চাঁদাবাজির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে পুলিশ আটক করেছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় যুবদল থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে দলের পরিচয় ব্যবহার করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দলের বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ যাচাই করে মোকাবিলা করা হবে। অর্থাৎ, প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবিলার অবস্থান নিয়েছে দলটি।