ঢাকাশুক্রবার , ১৯ জুন ২০২৬

ভরা মৌসুমেও মেঘ-বৃষ্টির দেখা নেই: বরিশালের মোকামে ‘ইলিশ খরা’, কেজি ছুঁল ৩ হাজার টাকা

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুন ১৯, ২০২৬ ১:০২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬৩

নিজস্ব প্রতিবেদক :: ভরা মৌসুম শুরু হলেও মেঘের দেখা নেই, নেই কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের ইলিশের অন্যতম প্রধান মোকাম বরিশালের পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। যেখানে আষাঢ়ের এই সময়ে রূপালি ইলিশের গন্ধে আর ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে পা ফেলার জায়গা থাকার কথা নয়, সেখানে এখন বিরাজ করছে খাঁ খাঁ নীরবতা। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ‘ইলিশ খরা’র কারণে আড়তগুলোতে বেচাকেনা নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়, যার ফলে সাধারণ মানুষের পাতে ওঠার আগেই ইলিশের দাম ছূঁয়েছে আকাশ।

পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ১৭০টি আড়তের চিত্র এখন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। মোকাম মালিক-সমিতির সাবেক অর্থ সম্পাদক ইয়ার হোসেন শিকদার এই সংকটের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে বলেন, ভরা মৌসুমে এই পোর্টে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার মণ ইলিশ আসতো। আর এখন বরিশালের সবকটি আড়ত মিলায়েও দিনে ২০-২৫ মণের বেশি মাছ মিলছে না। আগে যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মহোৎসব হতো, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ১৫-২৫ লাখ টাকার খুচরো বিক্রিতে।

মেসার্স দুলাল ফিশের ম্যানেজার মো. রবিন জানান, মাত্র বছর দুয়েক আগেও আড়তগুলোতে দিনশেষে ২ হাজার মণ মাছ কেনাবেচা হয়েছে। অথচ এখন চাহিদা থাকলেও জোগান না থাকায় শূন্য হাতে ফিরছেন পাইকাররা।

সরবরাহে টান পড়ায় পোর্ট রোডের পাইকারি বাজারেই ইলিশের দর এখন সাধারণ ক্রেতার সাধ্যের বাইরে। লিয়ো আড়তের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন জানান, স্থানীয় নদীতে মাছ না থাকা এবং সাগরের মাছ কম আসায় দাম এতটা চড়া।

বর্তমানে পোর্ট রোড মোকামে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬৫০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়।

বাজারের এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় ক্রেতারা বলছেন, ভরা মৌসুমেও যদি এক কেজি ইলিশের দাম ৩ হাজার টাকা হয়, তবে সাধারণ মানুষের জন্য ইলিশের স্বাদ পাওয়া কেবল স্বপ্নই রয়ে যাবে।

মোকামে মাছ না থাকায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ঘাটের দিনমজুর ও লোড-আনলোড শ্রমিকদের পেটে। চিরচেনা কর্মব্যস্ত ঘাট এখন অলস। আড়তের সামনে গোল হয়ে বসে শ্রমিকদের লুডু খেলে সময় কাটাতে দেখা গেছে।

কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে শ্রমিক সাইফুল বলেন, আগে মাছ নামাইয়া দিনে হাজার-বারোশো টাকা কামাই করতাম। এহন ৩০০ টাকাও জোটে না। ধারদেনা কইরা সংসার চালাইতাছি।” আরেক শ্রমিক শহীদ অবশ্য এখনো আশাবাদী, “অনেকে কাজ ছাইড়া অন্যহানে চইলা গেছে। কিন্তু আমরা আশা ধইরা রাখছি। আর কয়ডা দিন পর যখন ইলিশে সয়লাব হইবো, তখন দিনরাইত কাজ কইরা সব দেনা শোধ করমু।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে কীর্তনখোলা নদীতে জাল ফেলেও খালি হাতে ফিরছেন জেলেরা। জেলে আনিস ও সাগরের কণ্ঠে ঝরে পড়ল চরম হতাশা। তারা বলেন, নদীতে ইলিশ তো দূরের কথা, জাটকাও নাই। নিষেধাজ্ঞা মাইন্যা চললাম, অথচ এহন নদীতে মাছ নাই। আর কিছুদিন এমন চললে জাল-নৌকা বেইচ্যা মানুষের দেনা শোধ করতে হইবো।” তবে তারা মনে করেন, আকাশ মেঘলা হয়ে ভারী বৃষ্টি নামলেই নদীর চিত্র রাতারাতি বদলে যাবে।

মৌসুমের শুরুতেই ইলিশের এই আকালের বিষয়ে অবশ্য এখনই আশাহত হতে নিষেধ করছেন বিশেষজ্ঞরা। বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, জুন থেকে ইলিশের মৌসুম শুরু ধরা হলেও, মূলত ‘ভরা মৌসুম’ শুরু হয় জুলাই থেকে। এ বছর মার্চ ও এপ্রিলে ষষ্ঠ অভয়াশ্রমে কড়া নজরদারি থাকায় জাটকা নিধন অনেক কমেছে। সাগরে ও নদীতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা সফল হয়েছে। এখন ইলিশ ধরায় কোনো বাধা নেই। কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত শুরু হলেই সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে উজানে আসবে এবং এই সংকট কেটে যাবে।