ঢাকাSaturday , 12 September 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মাদকের ভয়াল ছোবলে থমকে যাচ্ছে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যৎ

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৫৬

মো: আম্মার হোসেন আম্মান :: মেধা আছে, অর্থ আছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ আছে—অভাব নেই কোনো কিছুর। কারও বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কারও বাবা কোটিপতি ব্যবসায়ী, আবার কেউ প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিক পরিবারের সন্তান। কেউ বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, কেউ চিকিৎসাবিজ্ঞান বা প্রকৌশলে পড়াশোনা করেছেন, কেউবা ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরেছেন। অথচ সম্ভাবনাময় সেই জীবনগুলোর অনেকটাই এখন আটকে গেছে মাদকের ভয়াল জালে।

অর্থ, শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থান—কোনোটিই রক্ষা করতে পারেনি তাদের। ইয়াবা, অ্যালকোহল, গাঁজা, কোকেন থেকে শুরু করে ভয়ংকর মাদকের আসক্তিতে অনেকে হারিয়েছেন পড়াশোনা, চাকরি, ক্যারিয়ার ও স্বাভাবিক জীবন। কারও মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, কেউ ভুগছেন গুরুতর শারীরিক জটিলতায়। আর সন্তানকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে দিনের পর দিন নিরাময়কেন্দ্রের দরজায় ছুটছেন স্বজনরা।

রাজধানীর কয়েকটি অভিজাত মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই ভয়াবহ চিত্র। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে রয়েছেন ভিআইপি-সিআইপি পরিবারের সন্তান, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, বিদেশফেরত শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী, চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সন্তান।

উত্তরার একটি অভিজাত নিরাময়কেন্দ্রে চলতি মাসে ভর্তি হয়েছেন ২৬ জন রোগী। তাদের মধ্যে রয়েছেন একটি শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের এক পরিচালক। অ্যালকোহল ও ইয়াবার আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন।

একই কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৬ বছর বয়সী এক তরুণী। ধনাঢ্য পরিবারের এই তরুণী লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরলেও মাদকের ভয়াল আসক্তি তার ক্যারিয়ারে টেনে দিয়েছে আকস্মিক ব্রেক। আইন পেশায় যোগ দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই তাকে যেতে হয়েছে নিরাময়কেন্দ্রে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক শিক্ষার্থীর গল্প আরও করুণ। চীনে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে মাদকে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ধীরে ধীরে আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মানসিক ভারসাম্যেও দেখা দেয় গুরুতর সমস্যা। পড়াশোনা শেষ না করেই দেশে ফিরতে হয় তাকে। দেশে ফেরার পরও নেশা ছাড়তে না পারায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে চিকিৎসা।

পিছিয়ে নেই উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীরাও। ইউরোপের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নেওয়া এক প্রকৌশলী দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসের সময় ফেনটানিল ও কোকেনসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের মাদক সেবনে তার শরীরে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা।

রাজধানীর একটি কলেজের শিক্ষার্থীও বর্তমানে মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার বাবা প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। আবার গাজীপুরের একটি নামকরা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এক প্রকৌশলী গাঁজায় আসক্ত হয়ে হারিয়েছেন স্বাভাবিক কর্মজীবন। একসময় রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে কর্মরত থাকলেও মাদকই এখন তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাধা।

ইয়াবার নেশায় আক্রান্ত আরেক তরুণের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা, মা ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা দম্পতির এই সন্তানকে ঘিরে এখন পুরো পরিবারই বিপর্যস্ত। দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তির পর তাকে নিতে হয়েছে চিকিৎসার আশ্রয়।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এক যুবকের জীবনও মাদকের কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় মাদকে জড়িয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও আবার বিদেশে ফেরার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ফের ডোপ টেস্টে মাদক শনাক্ত হলে সেখানে তার ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ধানমণ্ডির শুক্রাবাদ এলাকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তানও ইয়াবার ভয়াল ছোবল থেকে বের হতে পারছেন না। একাধিকবার চিকিৎসা নেওয়ার পরও স্থায়ীভাবে সুস্থ হতে পারেননি তিনি। দীর্ঘদিনের মাদক সেবনে শরীরেও দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা।

রাজধানীর একটি নামকরা রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের মালিকের একমাত্র ছেলেও মাদকের কাছে পরাজিত। দীর্ঘদিনের আসক্তিতে তার মধ্যে দেখা দিয়েছে গুরুতর মানসিক জটিলতা। বর্তমানে মানসিক রোগের পাশাপাশি মাদকাসক্তির চিকিৎসাও চলছে।

আবার অর্থ-বিত্ত থাকলেও নিঃসঙ্গতা যে মানুষকে কতটা বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে, তার উদাহরণও মিলেছে। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সন্তান না হওয়া, পরবর্তী সময়ে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদ—সব মিলিয়ে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী চরম একাকিত্বে ডুবে যান। একপর্যায়ে সেই নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হয় মাদক। বর্তমানে তিনিও নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।

অর্থ আছে, চিকিৎসার সুযোগ আছে—তবুও ফিরছে না স্বাভাবিক জীবন

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও সে তুলনায় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ এখনও অপ্রতুল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখের বেশি হলেও ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, একাকিত্ব, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, অঢেল অর্থবিত্ত, পর্যাপ্ত পারিবারিক নজরদারির অভাব এবং অতিরিক্ত স্বাধীনতার অপব্যবহার তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মাদক শুধু একজনকে নয়, ধ্বংস করছে পুরো পরিবার

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্তিকে কেবল ‘খারাপ অভ্যাস’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি গুরুতর স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। একজন তরুণ মাদকে জড়িয়ে পড়লে তার সঙ্গে ধসে পড়ে একটি পুরো পরিবার। অর্থ, শিক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদা—কোনোটিই একা একজন আসক্তকে সুস্থ জীবনে ফেরাতে পারে না।

তাদের মতে, শুধু নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, পারিবারিক কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা-পরবর্তী নিয়মিত নজরদারি। নইলে চিকিৎসা শেষে আবারও মাদকের অন্ধকারে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য হলো—যে সন্তানকে ঘিরে একটি পরিবার ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, মাদকের নেশা সেই স্বপ্নকেই মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের ক্ষেত্রেও যখন মাদকের ছোবল এতটা গভীরে পৌঁছে গেছে, তখন এটি আর কেবল কোনো একটি শ্রেণির সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের জন্যই একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা।