ঢাকাবুধবার , ১০ জুন ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে সাড়ে ৭ কোটি টাকা সংস্কার ব্যয়, বাস্তবে হয়নি কোনো কাজ : অ্যানেক্স ভবন পরিত্যক্ত

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুন ১০, ২০২৬ ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৫৭

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা সংস্কার ব্যয়, বাস্তবে হয়নি কোনো কাজ : অ্যানেক্স ভবন পরিত্যক্ত।

‘গায়েবি সংস্কার’ দেখিয়ে খরচ সাড়ে ৭ কোটি টাকা×
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুড়িয়ে দেওয়া বরিশাল সিটি করপোরেশনের অ্যানেক্স ভবন। ছবিটি গত সোমবার দুপুরে তোলা সমকাল

 

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুড়িয়ে দেওয়া হয় বরিশাল সদর রোডের অ্যানেক্স ভবনে অবস্থিত বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তর। সিটি করপোরেশনের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এই ভবনসহ আরও কয়েকটি ভবন সংস্কারে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ এখনও অ্যানেক্স ভবনটি বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কীভাবে এই খরচ দেখানো হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিসির নানা দপ্তরের কর্মকর্তারা অন্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর দায় চাপিয়েছেন।

বিসিসি প্রকৌশল শাখা সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত দুই বছরে অ্যানেক্স ভবন, নগর ভবন বা বিসিসির মালিকানাধীন কোনো ভবনই সংস্কার অথবা রঙের কাজ করা হয়নি। ভবন সংস্কারে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা কোথায় খরচ হয়েছে–এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিপুল এই খরচ দেখানোর সময় বিসিসি প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার মো. রায়হান কাওছার।
বিসিসির হিসাব শাখা সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খরচ দেখানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, অ্যানেক্স ভবন ও অন্যান্য ভবন মেরামত এবং সংস্কারে সাড়ে ৭ কোটি ৪২ লাখ ৬ হাজার ৯৩ টাকা খরচ হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিসিসির মালিকানাধীন নগর ভবন, আমানতগঞ্জের যান্ত্রিক শাখা ও পানি শাখা এবং নগরের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি উপস্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটিতেও এই সময়ের মধ্যে কোনো ধরনের সংস্কারকাজ হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অ্যানেক্স ভবনে তৎকালীন মেয়র (২০১৮-২৩) সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর দপ্তর ছিল। সেখানে হিসাব শাখা, পরিকল্পনা অনুমোদন শাখা, পরিচ্ছন্ন শাখা ও স্বাস্থ্য শাখা ছাড়াও পঞ্চম তলায় একটি রেস্ট হাউস ছিল। নিচতলায় ছিল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়, বিদ্যুতের অভিযোগ কেন্দ্র ও একটি জামে মসজিদ। ২০২৩ সালে নির্বাচিত সর্বশেষ মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ মেয়রের দপ্তর, হিসাব ও পরিকল্পনা শাখা নগর ভবনে নিয়ে যান। অন্যান্য দপ্তর অ্যানেক্স ভবনেই রাখা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাত ৯টা পর্যন্ত সেখানে আগুন জ্বলে। ফলে নিচতলা থেকে পঞ্চমতলা পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার মেয়রকে অপসারণ করে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার শওকত আলীকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তী বিভাগীয় কমিশনার ও সিটির প্রশাসক রায়হান কাওছারের সময় বরাদ্দ আসে। কাগজপত্রে তিনি সেই বরাদ্দ পুরোটাই ভবন সংস্কার ও মেরামত ব্যয় দেখিয়েছেন। বাস্তবে অ্যানেক্স ভবনটি আগের মতোই পড়ে আছে। অন্যদিকে বিসিসির প্রাণকেন্দ্র নগর ভবনেও দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার হয়নি। প্রায়ই এ ভবনের বিভিন্ন কক্ষের পলেস্তারা খসে পড়ছে।
অ্যানেক্স ভবনের পূর্বপাশের ফুটপাতে দীর্ঘদিন ধরে চা বিক্রি করেন নগরীসংলগ্ন চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. পলাশ। তিনি জানান, আগুন দেওয়ার অনেকদিন পর সিটি করপোরেশনের শ্রমিকেরা পোড়া মালপত্র সরিয়ে নিয়ে যান। এর পর থেকেই ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। তিনি কিছু মেরামত করতে দেখেননি।

বিসিসির প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার বলেন, অ্যানেক্স ভবনটি পুনরায় ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ‘ডিজাইন ভেল্যু আর্কিটেক্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, রিট্রোফাইটিং করে ভবনটি পুনরায় ব্যবহার করা যাবে। এতে খরচ হবে অন্তত সাড়ে ৬ কোটি টাকা। এরপরে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।
হিসাবরক্ষক কাম বাজেট কর্মকর্তা মো. মইনুদ্দিন বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৯ মাসের খরচে ভবন সংস্কার বাবদ প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। প্রকৌশল
শাখার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আমরা বাজেটে সেটি উল্লেখ করেছি। কোথায় খরচ হয়েছে সেটি প্রকৌশল শাখা জানে।’

হিসাব শাখা সূত্র জানায়, থোক বরাদ্দ পাওয়ার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটে বিসিসির নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন ব্যয় হিসেবে নগর ভবন, অ্যানেক্স ভবন ও অন্যান্য ভবন মেরামত ও সংস্কারে ২০ লাখ টাকা রাখা হয়েছিল। প্রথম ৯ মাসে সংস্কার খাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭ টাকা। ২০২৫ সালের জুন মাসে পুরো ২০ লাখ টাকাই সংস্কার বাবদ খরচ দেখানো হয়।

প্রধান প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবিরের দাবি, ভবন সংস্কার কিছু কিছু হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, কাগজে ভবন সংস্কার দেখানো হলেও সেই টাকা অন্য কোনো উন্নয়ন খাতে খরচ হয়েছে। বিষয়টি হিসাব বিভাগই ভালো বলতে পারবে।
এসব ব্যয় দেখানোর সময় একই পদে ছিলেন বিসিসির প্রধান নিবাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী। তিনি বলেন, বুয়েট রিপোর্ট অনুযায়ী অ্যানেক্স ভবন ব্যবহার উপযোগী নয়। সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের ভবন সংস্কার বাবদ সাড়ে ৭ কোটি টাকা খরচ প্রসঙ্গে তার দাবি, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।