ঢাকাTuesday , 28 July 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে ভাইরাল হওয়ার নেশায় কিশোর সমাজ অস্ত্রের মহড়া

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬৯

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে ভাইরাল হওয়ার নেশায় কিশোর সমাজ অস্ত্রের মহড়া।

একসময় কিশোর বয়স মানেই ছিল খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্ন দেখার সময়। কিন্তু সেই বয়সের একটি অংশ এখন জড়িয়ে পড়ছে ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতায়। হাতে বইয়ের বদলে দেশীয় অস্ত্র, খেলাধুলার মাঠের বদলে টিকটকের ভিডিও, আর স্বপ্নের জায়গা দখল করছে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। বরিশালে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার নেশায় অস্ত্র হাতে ভিডিও ধারণ ও প্রচারের ঘটনা নগরবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে।

 

 

সম্প্রতি দেশীয় অস্ত্র হাতে ভিডিও ধারণ করে টিকটকে প্রচারের অভিযোগে সাত কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি)। ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে নগরজুড়ে। তদন্তের মাধ্যমে ভিডিওতে অংশ নেওয়া সাতজনকে শনাক্ত করে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এ ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা তদন্ত করছে পুলিশ।

 

 

তবে এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি মাসের শুরুতেই নগরীর কালীবাড়ী রোড এলাকা থেকে কথিত একটি কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানসহ চারজনকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। একই সময়ে পৃথক অভিযানে বটতলা এলাকার কিশোর গ্যাং লিডার রাফসানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। ধারাবাহিক অভিযানে একাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হলেও কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

 

নগরজুড়ে সক্রিয় একাধিক কিশোর গ্যাং
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, বরিশাল নগরীতে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি কিশোর গ্যাং বিভিন্ন নামে সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা মূলত নির্দিষ্ট এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে সংঘবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এসব গোষ্ঠীর একটি অংশ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা বদলালেও তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।

 

 

মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, ত্রিশ গোডাউন, বেলস পার্ক, বরিশাল জিলা স্কুল এলাকা, ভাটিখানা, দপ্তরখানা, কাঠপট্টি, কাউনিয়া, পলাশপুর, কেডিসি, বিএম স্কুল, কলেজ রোড, কাশিপুর, নথুল্লাবাদ, রূপাতলী, আমতলার মোড় ও বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

টিকটক এখন ‘ক্ষমতা প্রদর্শনের’ মঞ্চ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে। আগে অপরাধ সীমাবদ্ধ থাকত নির্দিষ্ট এলাকায়। এখন সেটি ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইনে। অস্ত্র হাতে ছবি কিংবা ভিডিও প্রকাশ করে নিজেদের সাহসী ও প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা বাড়ছে।

 

ভিউ, লাইক, ফলোয়ার ও ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক সময় ভিডিওর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া, নতুন সদস্য আকৃষ্ট করা কিংবা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য জানান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফলে একটি ভিডিও শুধু বিনোদনের কনটেন্ট নয়, বরং ভবিষ্যৎ সহিংসতার ইঙ্গিতও বহন করতে পারে।

 

অপরাধের পেছনে যেসব কারণ
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে।

 

পারিবারিক নজরদারির অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া, মাদকের সহজলভ্যতা, বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, নেতিবাচক বন্ধুমহল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার—এসব কারণ কিশোরদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।

 

অনেক কিশোরের কাছে দ্রুত পরিচিতি পাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়াই যেন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। সেই লক্ষ্য পূরণে তারা অস্ত্র প্রদর্শন, ভয়ভীতি সৃষ্টি কিংবা সংঘর্ষে জড়াতেও দ্বিধা করছে না।

 

অভিযোগের তালিকায় মাদক, ছিনতাই ও হয়রানি
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা শুধু মারামারি বা আধিপত্য বিস্তারেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে র‌্যাগিং, ছিনতাই, মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, যৌন হয়রানি এবং চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।

 

বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষ এসব গ্যাংয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে প্রায়ই গ্যাংগুলোর মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

 

পুলিশের অভিযান, কিন্তু সমাধান কতটা?
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সুশান্ত সরকার জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বিএমপি জোরালোভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

 

তবে সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, শুধু অভিযানে কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অপরাধ দমনে কার্যকর হলেও নতুন নতুন কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠা ঠেকাতে সামাজিক উদ্যোগও সমান জরুরি।

 

কী হতে পারে সমাধান?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর গ্যাং দমনে শুধু গ্রেপ্তার নয়, প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও প্রয়োজন। পরিবারকে সন্তানের চলাফেরা ও অনলাইন কার্যক্রমে নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকবিরোধী সচেতনতা জোরদার করতে হবে।

 

এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

 

নিরাপদ বরিশাল গড়তে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন
কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আর শুধুই আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। আজ যারা ভাইরাল হওয়ার নেশায় অস্ত্র হাতে ভিডিও করছে, তাদের অনেকেই আগামী দিনের সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সদস্য হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

নগরবাসীর প্রত্যাশা, ভাইরাল ভিডিও প্রকাশের পর নয়, বরং কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার আগেই কার্যকর নজরদারি, সামাজিক সচেতনতা এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নিরাপদ বরিশাল গড়তে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।