ঢাকাSunday , 16 August 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাটে ইজারার আড়ালে চাঁদাবাজির অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৮৪

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালের সদর উপজেলার লাহারহাট ফেরিঘাটে সরকারি নির্ধারিত ইজারা আদায়ের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও ‘সিরিয়ালের নামে’ চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় এক বিএনপি নেতা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পরিবহন থেকে প্রকাশ্যে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবি, সরকারি রেট চার্ট টাঙানো না থাকায় ইচ্ছেমতো অর্থ আদায় করা হচ্ছে এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর কিছু অসাধু কর্মকর্তা রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছেন।

রেট চার্ট না টাঙিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বিআইডব্লিউটিএর রহস্যজনক নীরবতায় ক্ষোভে ফুঁসছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক

লাহারহাট ফেরিঘাটে ‘সিরিয়াল বাণিজ্য’ ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে চরম অস্বস্তি, জড়িত থাকার অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি নেতা-ইজারাদারের বিরুদ্ধে

 

অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদপুরা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল খান তার লোকজন দিয়ে প্রতিটি পরিবহন থেকে ‘সিরিয়ালের নামে’ অতিরিক্ত ১০০ টাকা করে আদায় করছেন। প্রতিদিন শতাধিক পরিবহন এই ঘাট ব্যবহার করায় শুধুমাত্র এই অবৈধ আদায় থেকেই দৈনিক ১০ হাজার টাকারও বেশি অর্থ সংগ্রহ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দাবি, এই অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগাভাগি করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ থাকলেও অভিযুক্ত নেতার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও বরিশাল বন্দর বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে লাহারহাট ফেরিঘাটে একই ধরনের অতিরিক্ত অর্থ আদায় চলত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিবাদের মুখে তৎকালীন ইজারাদার রেজাউল ইসলাম চাপে পড়েন। পরে সেনাবাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিবহনপ্রতি ১০০ টাকা করে অবৈধ আদায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর প্রায় এক বছর বরিশাল মহানগর বিএনপির ১০ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা মো. কামরুজ্জামান ঘাট পরিচালনা করলেও ওই সময়ে সিরিয়ালের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ, চলতি বছরের ১ জুলাই নতুন ইজারা কার্যকর হওয়ার পর থেকেই আবার পুরনো সেই অবৈধ অর্থ আদায়ের প্রথা চালু করা হয়েছে। শুধু সিরিয়ালের নামে ১০০ টাকা নয়, অনেক সময় নির্ধারিত ইজারার বাইরেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বিএনপি নেতা সাইফুল খানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছেন সাবেক ইজারাদার রেজাউল ইসলাম। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রেজাউলই সাইফুল খানকে এই অবৈধ অর্থ আদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করতে উৎসাহিত করেন। তাদের নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে আল-আমিন, সাইদুল ও পরশ নামে তিন যুবক নিয়মিত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে নিয়োজিত রয়েছেন।

সরেজমিনে যা দেখা গেল

গত শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদক নিজ চোখে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। ইজারা আদায়ে নিয়োজিত রায়হান নামে এক যুবকও স্বীকার করেন, প্রতিটি গাড়ি থেকে ১০০ টাকা করে সিরিয়াল বাবদ নেওয়া হয় এবং এই টাকা আল-আমিন, সাইদুল ও পরশ সংগ্রহ করেন। এ সংক্রান্ত একটি গোপন ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেখানে নির্ধারিত ইজারা ৭৫ টাকা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। কোনো পরিবহন শ্রমিক আপত্তি করলে তাকে গালিগালাজ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি শারীরিকভাবে হেনস্থারও অভিযোগ রয়েছে।

তাদের প্রশ্ন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রকাশ্যে এই কার্যক্রম চললেও কেন সংশ্লিষ্ট বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না? অভিযোগ করার পরও কেন কোনো প্রতিকার মিলছে না?

রেট চার্ট নেই, তাই চলছে অবাধ অর্থ আদায়

সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএর আওতাধীন প্রতিটি ফেরিঘাটে দৃশ্যমান স্থানে নির্ধারিত রেট চার্ট টাঙিয়ে রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু লাহারহাট ফেরিঘাটে দীর্ঘদিন ধরেও কোনো রেট চার্ট দেখা যায়নি।

সাবেক কয়েকজন ইজারাদারের ভাষ্য, রেট চার্ট টাঙানো থাকলে অতিরিক্ত অর্থ আদায় কিংবা সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি চালানো সম্ভব হতো না। তাই পরিকল্পিতভাবেই রেট চার্ট টাঙানো হচ্ছে না। এতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা প্রকৃত সরকারি নির্ধারিত হার সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছেন এবং ইজারাদারদের ইচ্ছামতো অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

সিরিয়ালের নামে অতিরিক্ত ১০০ টাকা আদায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সাইফুল খানকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো কল রিসিভ করেননি।

অন্যদিকে তার সহযোগী রেজাউল ইসলাম প্রথমে অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন এবং নিজেকে ঘাটের ইজারাদার নন বলে পরিচয় দেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনিই আবার প্রতিবেদককে ফোন করে একসঙ্গে চা খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং নিজেকে ঘাটের ইজারাদার হিসেবে পরিচয় দেন। প্রতিবেদক যখন জানতে চান, আগে কেন তিনি নিজেকে ইজারাদার নন বলেছিলেন, তখন তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তার বক্তব্য

বরিশাল বন্দর কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সাইফুল খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজির অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, “আগে এগুলো ছিল, কিন্তু ৫ আগস্টের পর বন্ধ হয়ে গেছে। এখন নতুন করে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইজারাদারকে নোটিশ দেওয়া হবে এবং দ্রুত ফেরিঘাটে রেট চার্ট টাঙানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

তবে প্রশ্ন উঠেছে, ১ জুলাই ইজারা কার্যকর হওয়ার পর থেকে এতদিন কেন রেট চার্ট টাঙানো হয়নি? এর জবাবে তিনি বলেন, “রোববার অফিস খোলার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

৭৫টির বেশি ঘাট, কোথাও নেই রেট চার্ট!

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ৭৫টিরও বেশি ফেরিঘাট ও ইজারা পয়েন্ট রয়েছে। কিন্তু এসব ঘাটের একটিতেও সরকারি রেট চার্ট টাঙানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ, রেট চার্ট টাঙানো হলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সিরিয়ালের নামে বাণিজ্য এবং প্রকাশ্য চাঁদাবাজি অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেই কারণেই ইজারাদার ও বিআইডব্লিউটিএর অসাধু একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে রেট চার্ট না টাঙিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি আড়ালে রেখে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে।

স্থানীয়দের দাবি, লাহারহাট ফেরিঘাটে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সিরিয়াল বাণিজ্য এবং রেট চার্ট না টাঙানোর বিষয়ে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর আওতাধীন সব ফেরিঘাটে অবিলম্বে সরকারি রেট চার্ট টাঙিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটানোর জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।