
নিজস্ব প্রতিবেদক :: এক দুর্ঘটনায় থেমে গেল ৯ জীবন, ভেঙে গেল পরিবারগুলোর স্বপ্ন।
শুক্রবার সকালটি ছিল অন্য দিনের মতোই। রাজধানীর পথে যাত্রা করেছিলেন ২২ বছর বয়সী সপ্তম রায় প্রীয়ম। কিন্তু সে যাত্রাই হয়ে উঠল জীবনের শেষ সফর। সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিনি। আর তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন ভেঙে পড়েছে একটি পুরো পরিবার।
প্রীয়ম ছিলেন বৃদ্ধ মা ও বোনের একমাত্র অবলম্বন। ছোটবেলাতেই পানিতে ডুবে মারা যায় তার একমাত্র ভাই। এরপর থেকে সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। সীমাহীন অভাব-অনটনের মধ্যেও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। কিন্তু এক মুহূর্তেই সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
নিহত প্রীয়মের খালাতো বোনের জামাই কাজল ভৌমিক কালবেলাকে বলেন, প্রীয়মই ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। তার আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলত বৃদ্ধ মা ও বোনের পুরো সংসার। অনেক কষ্ট আর অভাবের মধ্য দিয়েই দিন পার করছিল পরিবারটি। ছোটবেলায় পানিতে ডুবে মারা যান প্রীয়মের একমাত্র ভাই। এরপর থেকে সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন প্রীয়ম। আজ সেই প্রীয়মও চলে গেল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে তার মা ও বোন একেবারেই অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাদের মাথার ওপর থেকে যেন শেষ আশ্রয়টুকুও সরে গেছে। এখন এই পরিবারটির সামনে শুধু শোক নয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কঠিন বাস্তবতাও দাঁড়িয়ে আছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ৭টা ১০ মিনিটে ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের একটি নাইট স্লিপার কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ৯ জন নিহত হন এবং আহত হন অন্তত ১৪ জন।
শেষ গান গেয়ে লাশ হয়ে ফিরলেন বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলেই সাতজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত আরও দুজনকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। বর্তমানে হাসপাতালে ১৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন এবং বাকি আহতদের চিকিৎসা চলছে।
একমাত্র উপার্জনক্ষম প্রীয়মকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের একটি নাইট স্লিপার কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় ইউনিক পরিবহনের বাসটির ডান পাশ সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলেই ৭ জন নিহত হন। পরে গুরুতর আহত দুজনকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে দাঁড়ায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। আহতদের উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাইওয়ে পুলিশ নিহতদের পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। তারা হলেন- কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের সাইফুল ইসলাম (৫০), দক্ষিণ সুরমার ফাইজা (৩), সিলেট নগরের সোবহানীঘাট এলাকার সপ্তম রায় প্রীয়ম (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার শিল্পী পেহেলী ভৈরবী (১৭) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার আবুল হোসেন (৪৪)।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি একটি পিকআপ ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ইউনিক পরিবহনের বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষের তীব্রতায় ইউনিক পরিবহনের বাসটির ডান পাশ সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি আনিসুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ঢাকা থেকে আসা বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাস পিকআপ ভ্যানকে পাশ কাটাতে যায়। এ সময় সিলেট থেকে ছেড়ে যাওয়া ইউনিক পরিবহনের বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ ও আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। নিহত ও আহতদের নাম সংগ্রহ করা হচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশ সিলেট রিজিয়নের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম কালবেলাকে বলেন, প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিজ লেনেই চলছিল। এ সময় ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে বিপরীত পাশে চলে আসে এবং ইউনিক পরিবহনের বাসটিকে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ।
তিনি বলেন, ধাক্কার তীব্রতায় ইউনিক পরিবহনের বাসটির ডান পাশ সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে। বাসটির ডান পাশের আসনে থাকা যাত্রীদের ৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ জন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। একইসঙ্গে নিহত ও আহতদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাস দুটি আমাদের হেফাজতে নিয়ে আসা হয়েছে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আবদুল্লাহ কায়সার কালবেলাকে বলেন, দুর্ঘটনায় মোট ১৬ জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান। বর্তমানে একজন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন, আর বাকি ১৩ জনের অবস্থা স্থিতিশীল।
তিনি বলেন, কারও কারও স্বজন হাসপাতালে পৌঁছেছেন, আবার কয়েকজনের স্বজন এখনো আসেননি। তবে এতে চিকিৎসায় কোনো ব্যাঘাত হচ্ছে না। শয্যা খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ট্রায়াজ পদ্ধতি অনুসরণ করে গুরুতর আহতদের সিটি স্ক্যানসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে এবং অন্যদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে আহতদের সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনীর কালবেলাকে বলেন, দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে মোট ১৬ আহতকে আনা হয়। এর মধ্যে চার বছরের শিশু জাইফাকে মৃত অবস্থায় (ব্রট ডেড) আনা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রীয়ম নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ১৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি বলেন, আহতদের সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। ক্যাজুয়ালটি বিভাগে থাকা পাঁচজনের অবস্থা শঙ্কামুক্ত এবং শিগগিরই তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হবে। ইএনটি বিভাগে ভর্তি দুজনের অবস্থাও স্থিতিশীল। চক্ষু বিভাগে পাঁচজনের মধ্যে চারজনের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে এবং একজনের চোখে গুরুতর আঘাত থাকায় অস্ত্রোপচার চলছে। নিউরো সার্জারিতে ভর্তি তিনজনের মধ্যে দুজনের অবস্থা ভালো হলেও আফতাব নামে একজনের মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। তাকে আইসিইউতে রেখে নিবিড় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিচালক আরও বলেন, শয্যা সংকটের কারণে কয়েকজন রোগীকে সাময়িকভাবে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হলেও বেড খালি হলেই তাদের স্থানান্তর করা হবে। এটি বড় দুর্ঘটনা হওয়ায় আহতদের সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ না করা পর্যন্ত বিশেষ পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হবে। পাশাপাশি হাসপাতালের মর্গে ১২টি মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে এবং পুলিশ ও প্রশাসনের প্রয়োজনীয় সব কাজে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন কালবেলাকে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান থাকলেও দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে সড়ক বিভাগ ও পুলিশই বিস্তারিত জানাতে পারবে। এছাড়া শুক্রবার সকালে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ৭ জন নিহত হন। পরে আহত ১৬ জনকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে একজনকে মৃত অবস্থায় আনা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান।
জেলা প্রশাসক বলেন, আফজাল নামে একজন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহত বাকি ১৩ জনের মধ্যে ৪ জনকে আজই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদের চিকিৎসা চললেও তারা আশঙ্কামুক্ত।
তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে সময় লাগবে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে এবং হাসপাতাল থেকে পরবর্তী আপডেট জানানো হবে। আহতদের চিকিৎসা ও ওষুধের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা যেন না হয় তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিহতদের পরিবার এবং আহতদের দাফনের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

