
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে মামলা বানিজ্যের মাষ্টারমাইন্ড মারজুক আব্দুল্লাহকে খুঁজছে পুলিশ! মৃত ব্যক্তি, কারাগারে থাকা আসামি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে দায়ের করা একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছেন জাতীয় ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগর শাখার সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারজুক আব্দুল্লাহ। এদিকে তার বিরুদ্ধে পটুয়াখালীর দুমকি থানায় দায়ের হওয়া একটি ডাকাতি চেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. আশিক সাঈদ।
রোববার (৫ জুলাই) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পুলিশ কমিশনার বলেন, মারজুক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে থাকা ওয়ারেন্টের কপি তিনি হাতে পেয়েছেন এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সম্প্রতি বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২৪৮ জনকে আসামি করে একটি অভিযোগ দায়ের করেন মারজুক আব্দুল্লাহ। অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও পেট্রোল বোমা ব্যবহার, সড়ক অবরোধ এবং নাশকতার মতো বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। আদালত অভিযোগটি সরাসরি মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে তদন্তের জন্য বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনারকে দায়িত্ব দেন।
অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কারণ, আসামির তালিকায় এমন কয়েকজন ব্যক্তির নাম রয়েছে, যারা বহু আগেই মারা গেছেন। এছাড়া কারাগারে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ওই তালিকায় থাকা কয়েকজনের কাছে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নাম বাদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ দাবি করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, আসামির তালিকা থেকে নাম প্রত্যাহারের শর্তে তাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া অভিযোগপত্রে বিএনপির অন্তত কয়েকজন নেতাকর্মীর নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ অভিযোগে ২৪৮ জনকেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।
মারজুক আব্দুল্লাহ জুলাই-পরবর্তী সময়ে বরিশালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে হলেও নানাবাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়নে। কয়েক বছর ধরে তিনি বরিশাল নগরীতে বসবাস করছেন।
গত বছরের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুসহ আওয়ামী লীগের ২৪৭ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন ঘিরে প্রথম মামলা করেন মারজুক। ওই সময়ও তার বিরুদ্ধে মামলার আসামি তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়।
পরবর্তীতে আরও একটি মামলার উদ্যোগ নিলেও প্রশাসনের তৎপরতায় তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো বিলুপ্ত হলে তিনি জেলা সমন্বয়কের পদ হারান। পরে জাতীয় ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেলেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে সেই কমিটিও বাতিল করা হয়। এর আগে তিনি বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
এদিকে মারজুক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে পটুয়াখালীর দুমকি থানায় দায়ের হওয়া একটি ডাকাতি চেষ্টার মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ জুন পায়রা সেতু এলাকায় অস্ত্রের মুখে ডাকাতির চেষ্টার অভিযোগে পুলিশ মামলাটি দায়ের করে। ওই মামলার অপর দুই আসামি জামিনে মুক্তি পেলেও মারজুক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে এখনও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বহাল রয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, “আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি আগে জানা ছিল না। এখন ওয়ারেন্টের কপি হাতে পেয়েছি। আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন, “আগেও এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। নতুন করে এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন।”
বরিশাল আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, অভিযোগটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে আদালত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে মারজুক আব্দুল্লাহর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

