
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেচ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।
দেশীয় প্রায় সাড়ে ৩শ কোটি টাকার তহবিলে বরিশাল কৃষি অঞ্চলের ২৮ উপজেলায় অতিরিক্ত সাড়ে ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে ৬৬ হাজার টন বাড়তি খাদ্য উৎপাদনের প্রকল্পটি ইতোমধ্যে ৮৫ ভাগ সম্পন্ন করেছে বিএডিসি । আগামী ডিসেম্বরের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটির কাজ সম্পন্নের আশা করছে বিএডিসি’র দায়িত্বশীল মহল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে। পরিপূর্ণভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করে ভূ-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও ডিজেলের পরিবর্তে সৌর বিদ্যুৎ বা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে।
প্রায় ১২ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত বরিশাল কৃষি অঞ্চলে সেচেযোগ্য জমির অর্ধেকও এখনো সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বিগত রবি মৌসুমে এ অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচাবাদেও মাধ্যমে বোরো ধানের আবাদ হলেও তারমধ্যে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন-বিএডিসি’র অবদান এখনো ৩০ হাজার হেক্টরেরও কম। উপরন্তু এ অঞ্চলের কৃষি-সেচ কাজে যে প্রায় ২২ হাজার সেচ পাম্প মাঠে ব্যবহ্রত হচ্ছে তার ১০ ভাগের কম বিদ্যুতচালিত। অথচ বিদ্যুতের চেয়ে ডিজেল ব্যবহ্রত সেচ ববস্থায় ব্যয় দেড়গুনেরও বেশি। ২০০২ সাল থেকে সরকার কৃষি-সেচকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ওপর ২০% ভর্তুকিও প্রদান করে আসছে। কিন্তু ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রে ব্যয় বেশী হলেও ২০০৫-০৬ অর্থ বছরের পরে আর কোন ভর্তুকি দেয়া হচ্ছেনা। অথচ বরিশাল অঞ্চলে সেচ কাজে ব্যবহৃত ৯০ভাগ সেচ যন্ত্রই ব্যায়বহুল ডিজেলচালিত।
ফলে এ অঞ্চলে অত্যাধিক সেচ ব্যয়ের কারণে ধানের উৎপাদন ব্যয়ও দেশের যেকোন স্থানের চেয়ে বেশী। এতে একদিকে রবি মৌসুমে সেচাবাদে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে না, অপরদিকে অধিক ব্যয়বহুল সেচ ব্যয়ের কারণে তাদের ভাগ্যেরও পরিবর্তন হচ্ছে না। তবে সেচ যন্ত্রের অর্ধেকও বিদ্যুতায়িত করতে পারলে ২০ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব বলেও মনে করছেন কৃষিবীদরা। এ অঞ্চলে লোকসানে থাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোও আর্থিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে করছেন জ¦ালানী বিশেষজ্ঞরা।
এসব বিবেচনায় বিএডিসি বরিশাল কৃষি অঞ্চলে ‘সেচ উন্নয়ন প্রকল্প এর আওতায় আড়াইশ বিদ্যুতচালিত সেচযন্ত্র সংগ্রহ ছাড়াও ১ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন ২০টি সোলার লো-লিফট পাম্প সেট সংগ্রহ করে কৃষকদের সরবরাহ করছে। ইতোমধ্যে ২৪৮টি পাম্প সংগ্রহ সহ তা সেচকাজে সম্পৃক্ত হয়েছে। এছাড়া সৌর বিদ্যুতচালিত ২০টি সেচ পাম্প’র মধ্যে ১৮টি ইতোমধ্যে সংযুক্ত হয়েছে।
প্রকল্প এর আওতায় যে ৩৭৫ কিলোমিটার সেচ খাল পুন:খননের কথা ছিল, ইতোমধ্যে তার ৩৫৩ কিলোমিটার সম্পন্ন হয়েছে। ৫০টি বড় সেচ খাল পুন:খনন এবং প্রতি কিলোমিটারে ৪টি করে বিভিন্ন খালের পাড়ে প্রায় দেড় হাজার পানি নির্গমন স্থাপনা নির্মান করা হচ্ছে। প্রকল্পটির আওতায় ২৫০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মানের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি ৪০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ কিলোমিটার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ৭৫টি সোলার ড্রিপ’র ৬১টির নির্মান কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া দেড়শ বক্স কালভার্টের মধ্যে ১২৫টির কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্টগুলোর কাজও আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন।
বরিশাল অঞ্চলে এ সেচ কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ওয়াটার পাস,পাইপ কালভার্ট ও ক্যাটল ক্রসিং এবং লো-লিফট পাম্প-এলএলপি’র পাম্প হাউজ সহ ফলের বাগান সমুহে সোলার ড্রিপ ইরিগেশন সিষ্টেম নির্মান করা হচ্ছে । প্রকল্পটির আওতায় পুন:খননকৃত খালে কৃষিজ পণ্য ওঠানামার সুবিধার্থে ১৫টি আরসিসি ঘাটলা, কৃষিপণ্য ও কৃষি যন্ত্রপাতি পরিবহনে দেড়শটি অবকাঠামো নির্মানেরও কথা রয়েছে।
সেচ কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্পটির আওতায় ১শ ব্যাচে বিপুল সংখ্যক কৃষককে প্রশিক্ষনেরও ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া সেচনালা নির্মানের লক্ষ্যে প্রায় এক কিউসিক ও ২ কিউসেক ইউপিভিসি পাইপ সেট স্থাপন ছাড়াও সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহ্রত লো লিফট পাম্পগুলোতে বিদ্যুৎ সুবিধাও নিশ্চিত করা হবে বলে জানা গেছে।
আগামী ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৬,৫০৪ হেক্টর জমিতে বাড়তি সেচ সুবিধা নিশ্চিতের মাধ্যমে ৬৬ হাজার টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপন্ন হবে বলে আশা করছে বিএডিসি’র দায়িত্বশীল মহল। একইসাথে ফলের বাগানেও সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন ফলের আবাদ ও উৎপাদন বাড়বে বলেও আশাবাদী কৃষিবীদ সহ বিএডিসি।
এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, আমরা প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি বাস্তাবায়নের চেষ্টা করেছি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি প্রধান বরিশাল অঞ্চলের কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তবে উল্লেখিত প্রকল্পটির যেসব কার্যক্রম সমুহ বাস্তবায়িত হচ্ছে,তা প্রকল্প এলাকার সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে মনে করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ধান গবেষনা ও কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট-এর দায়িত্বশীল মহল।

