
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডিআরপি’র মুখ্য সম্পাদক মাসুদ রানা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মূল কারণ দুটি। এক. আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব – বাঙালী আত্মপরিচয়ধারী জনগোষ্ঠীর সাথে ধর্মীয় আত্মপরিচয়ধারী জনগোষ্ঠী সংস্কৃতিতে, জীবনবোধে ও বিশ্ববোধে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করছে। পরিণতিতে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকেও ভিন্ন-ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতে চাইছে। দুই. রাষ্ট্রের সাথে রাজনীতির দ্বন্দ্ব – গনতান্ত্রিক রিপাবলিক পরিচালনার জন্য গণতান্ত্রিক রাজনীতি তথা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। অগণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতৃত্ব, কিংবা জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না এমন রাজনৈতিক দল কখনোই গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না। এই দুই দ্বন্দ্বের মিথস্ক্রিয়ায় রাষ্ট্রের জন্মকালীন প্রতিশ্রুতির সাথে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দ্বন্দ তৈরি হয়েছে। ‘৭১-এ জন্ম নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা যে রাজনৈতিক সংকট দেখছি, তা মূলত এই তিন দ্বন্দের উপসর্গ।
এই দ্বন্দ্বসমূহের নিরসনে তিনি একাত্তরের রাষ্ট্রবিপ্লব এবং বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতির ভিত্তিতে জাতীয় সংহতি স্থাপন এবং সর্বস্তরে একই পাঠ্যক্রমে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার আহ্বান জানান। এর জন্য রাজনীতিতে প্যারাডাইম শিফট প্রয়োজন। একমাত্র নতুন প্রজন্মই পারে নতুন প্যারাডাইমের রাজনীতি নির্মাণ করতে। বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যতম আলোচক সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের কথা বলেন। কিন্তু নিজেদের দলের ভেতরেই গণতন্ত্র নেই। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে অনেকেই সুযোগ নিতে চেয়েছে। ইনক্লুসিভনেসের কথা বলে ক্রমেই মানুষকে রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে এক্সক্লুড করা হয়েছে। অথচ গণতন্ত্র মানেই সবাইকে নিয়ে।
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, আমাদের জাতীয় সংকটের পেছনে আমাদের দায় আছে। তবে এখানে বিদেশেরও ভূমিকা আছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে জামায়াত-বিএনপির ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতা করেছে, অন্যদিকে কট্টর ধর্মভিত্তিক বিজেপির সাথে দহরমমহরম ছিল। ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার পরে গণতান্ত্রিক সরকারের যে আচরণ হওয়ার কথা, তার বদলে তারা মবক্রেসিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি’র সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, বাংলাদেশের ৫৫ বছরে যারা দেশ শাসন করেছে, তারা ছিল লুটেরা ধনিক শ্রেণির পাহারাদার। বামপন্থীরা ৫৫ বছরে অনেক ভুল করেছে। সেই ভুল থেকে অনেক শিক্ষা নিয়ে দ্বি-দলীয় বৃত্তের বাইরে থেকে বেরিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি ও রাষ্ট্র গঠন করতে চাই। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার। বামপন্থীদের নির্ভরশীলতার রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম শুধু ৯ মাসের লড়াই নয়, বরং ২০০ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। আওয়ামী লীগ ১৫-১৬ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিক্রি করে তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। অন্যদিকে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে ঠিকই, কিন্তু তাদেরও ভিন্নমত শোনার অবস্থায় নেই। রাজনৈতিক সহনশীলতা ও আলোচনার জায়গা কমে আসছে।
বিডিআরপির আন্তর্জাতিক-সম্পাদক আরিফ রহমান বলেন, জনরাষ্ট্র মঞ্চ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে দ্বিকক্ষ-বিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব রয়েছে, যা সত্যিকার অর্থেই আইনসভার ক্ষমতার ভারসাম্য নির্মাণ করবে, এবং অন্যদের প্রস্তাবিত দ্বিকক্ষ থেকে আলাদা।
সভাপতির বক্তব্যে বিডিআরপি’র সংগঠন-সম্পাদক আবুল খায়ের উজির বাবলু বলেন, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর একটি পক্ষ বাংলাদেশকে মৌলবাদী ও পাকিস্তানমুখী রাষ্ট্র করার চেষ্টা করে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক জনরাষ্ট্র মঞ্চ গঠিত হয়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংকট নিরসন করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে একটি প্রকৃত রিপাবলিক হিসাবে গড়ে তুলতে বিডিআরপি’র দশ বিন্দু রূপরেখার ভিত্তিতে রাষ্ট্র-সংস্কার করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

