ঢাকাThursday , 5 November 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সম্ভাবনার বাংলাদেশ ও অদৃশ্য বাধা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার স্বপ্নভঙ্গ

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
১১

মতামত কলাম, আরিফ রহমান  :: বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি কেবল বড় করপোরেশন বা শিল্পকারখানা নয়; এর মূল চালিকাশক্তি হলো পরিশ্রমী মানুষ, উদ্যমী তরুণ সমাজ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) প্রান্তিক পর্যায়ে গড়ে ওঠা ছোট ছোট উদ্যোগই গ্রামীণ ও শহরভিত্তিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ হোক, নৌ-পরিবহন বা ইকো-ট্যুরিজম হোক, কিংবা ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস (FMCG) ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবসা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের তরুণরা নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মেধা, শ্রম ও সততা দিয়ে গড়ে ওঠা এসব সম্ভাবনাময় উদ্যোগ বারবার থমকে যাচ্ছে এক অদৃশ্য ও নির্মম দেওয়ালের সামনে। সেই দেওয়ালের নাম—স্থানীয় চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক হয়রানি ও অস্বচ্ছ প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক।

ইকো-ট্যুরিজম ও গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনায় চাঁদাবাজের থাবা

আমাদের দেশের প্রতিটি অঞ্চলে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জনজীবনের অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। নদীমাতৃক এই জনপদে নদীপথ কিংবা সড়কপথকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট, হোমস্টে, নৌ-পরিবহন সেবা ও স্থানীয় পর্যটন উদ্যোগ। কোনো তরুণ উদ্যোক্তা যখন নিজস্ব পরিকল্পনা, সৃজনশীলতা ও সীমিত পুঁজি দিয়ে এমন একটি নতুন ইকো-ট্যুরিজম প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করাতে চান, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় চাঁদাবাজচক্র।

সবচেয়ে অদ্ভুত ও নির্মম সত্য হলো—এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত অনেকেরই বৈধভাবে ব্যবসা করার মতো পুঁজি বা সামর্থ্য থাকতে পারে। কিন্তু তারা উৎপাদনমুখী, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বা জনকল্যাণমূলক কোনো উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়। অন্যের শ্রম ও ঘামে গড়া উপার্জনের ওপর ভাগ বসানোই যেন তাদের সহজ পেশা। এই টেন্ডারবাজি ও দাদাগিরির মানসিকতার কারণে তরুণ ও সৃষ্টিশীল উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনাময় উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্ষতি হয় কেবল একজন উদ্যোক্তার নয়; বরং সম্ভাব্য কর্মসংস্থান, স্থানীয় সরবরাহ শৃঙ্খল, রাজস্ব আয় ও গ্রামীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণের সুযোগও হারিয়ে যায়।

ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবসা, মহাসড়কে চাঁদাবাজি ও মাসোহারা সংস্কৃতি

এই সংকট কেবল পর্যটন খাতে সীমাবদ্ধ নয়। ভোগ্যপণ্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবসার চিত্রও কম হতাশাজনক নয়। পণ্যের গাড়ি যখন ডিস্ট্রিবিউশনের উদ্দেশ্যে রাস্তায় নামে, তখন বিভিন্ন পয়েন্টে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য এবং কিছু অসাধু প্রশাসনিক সদস্যের মাসোহারা তোলার সংস্কৃতি ব্যবসা পরিচালনাকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল করে তোলে।

ফুটপাতে বসা একটি সাধারণ পানের দোকান থেকে শুরু করে পাইকারি বা মাঝারি ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই যদি পদে পদে চাঁদাবাজদের বখরা দিতে হয়, তবে সৎ ও স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তারা টিকবে কীভাবে ? যারা এই চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তারা একবারও ভেবে দেখেন না যে এসব ব্যবসার প্রসারের ফলে দেশের সরবরাহ চেইন সচল থাকে, অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয় এবং বেকারত্ব দূর হয়। চাঁদাবাজি আসলে এক ধরনের অদৃশ্য কর; এর ভার শেষ পর্যন্ত বহন করে উদ্যোক্তা এবং ভোক্তা—দুজনই। ফলে পণ্যের দাম বাড়ে, ব্যবসার প্রকৃত লাভ কমে এবং নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে যায়।

বেকারত্ব, আইন-শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ

দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ প্রবণতার অন্যতম বড় কারণ ব্যাপক বেকারত্ব। রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে একা সব যুবকের সরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে একমাত্র বেসরকারি খাত, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপগুলো। কিন্তু যখন একজন উদ্যোক্তা দেখেন যে তার সততার পুঁজি ও মেধার চেয়ে প্রভাবশালী মহলের চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন তিনি বিনিয়োগে ভয় পান। আর একটি সমাজে যদি উদ্যোক্তারা নিরাপত্তাহীন বোধ করেন, তাহলে সেখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও সংকুচিত হয়।

অথচ গভীরভাবে উপলব্ধি করলে বোঝা যায়, দেশের সরকার ও প্রশাসন যদি একটু প্রো-অ্যাক্টিভ হয় এবং কঠোর হাতে এই সিন্ডিকেটগুলো দমন করে, তবে পরিস্থিতি বদলানো খুব একটা কঠিন নয়। রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ নিশ্চিত করা। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন স্বল্প পুঁজির সৎ উদ্যোক্তারাই।

সময়ের দাবি ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ

আজ সময় এসেছে দেশে একটি সত্যিকারের বিনিয়োগবান্ধব, স্বচ্ছ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার। দেশের সাধারণ মানুষ যেন কোনো অনৈতিক হয়রানি ছাড়া, নিজের স্বল্প পুঁজি নিয়ে সম্মানের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে পারেন—তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের কাছে আমাদের আবেদন :

দলমত নির্বিশেষে পরিবহন ও স্থানীয় চাঁদাবাজদের নেটওয়ার্ক এবং টেন্ডার-সিন্ডিকেট কঠোরহস্তে দমন করতে হবে।
মহাসড়ক ও ব্যবসায়িক রুটগুলোতে পুলিশি হয়রানি ও মাসোহারা সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে; একই সঙ্গে অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নিরাপদ করিডোর ও আইনি সুরক্ষা সেল গঠন করতে হবে, যেখানে হয়রানির অভিযোগ তুললে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বাণিজ্য সংগঠন ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে রুট-ভিত্তিক মনিটরিং ও জবাবদিহি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ, বীমা, প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনার পাশাপাশি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে।
চাঁদাবাজিকে সামাজিকভাবে অস্বীকৃতি জানাতে মিডিয়া, তরুণ সমাজ ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনে সম্পৃক্ত করতে হবে।

তরুণদের মেধা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন যদি চাঁদাবাজদের গ্রাসে হারিয়ে যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও বেকারত্ব দূরীকরণে এখনই কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। সম্ভাবনার বাংলাদেশ গড়তে কেবল স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও উদ্যোক্তার প্রতি রাষ্ট্রের সদিচ্ছা। উদ্যোক্তা বাঁচলে কর্মসংস্থান বাঁচবে; কর্মসংস্থান বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আরিফ রহমান – লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক, আজীব সদস্য কবি নজরুল ইনস্টিটিউট ও যুগ্ম সম্পাদক বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম, আজীবন সদস্য বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি।