ঢাকামঙ্গলবার , ৭ জুলাই ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বরিশালে হাজার গ্রেফতার, শত শত মামলা : তবু থামছে না মাদকের ভয়াল কারবার

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
জুলাই ৭, ২০২৬ ২:৪০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬০

নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, শত শত মামলা এবং হাজারের বেশি গ্রেফতারের পরও থামছে না মাদক কারবার। বরং একই ব্যক্তি বারবার গ্রেফতার হয়ে জামিনে বেরিয়ে আবারও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি), আইনজীবী এবং আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বলছে, শুধু অভিযান বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের দুর্বলতা, এজাহার ও ফরওয়ার্ডিংয়ের তথ্যগত ঘাটতি এবং আইনি কৌশলের সুযোগে অভিযুক্তরা জামিন পাচ্ছেন। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণের পুরো প্রক্রিয়াই কাঙ্খিত ফল দিচ্ছে না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাদককে কেন্দ্র করে শুধু বেচাকেনাই নয়, আধিপত্য বিস্তার, অর্থ ভাগাভাগি এবং দেনা-পাওনা নিয়ে ঘটছে সংঘর্ষ ও হত্যাকা-। সম্প্রতি নগরীর পলাশপুর এলাকায় মাদকের টাকার ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মামলার প্রধান কয়েকজন আসামি এখনও গ্রেফতার হয়নি বলে নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে। এর আগে বাকেরগঞ্জ ও আগৈলঝাড়াতেও মাদককেন্দ্রিক বিরোধে হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে।

 

পলাশপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করা হয়। একজন বাসিন্দা বলেন, “বস্তিতে এমন অবস্থা হয়েছে যে মাদকের লেনদেন নিয়েই খুন হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। ভয় থাকে- উল্টো মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে।” নিহত এক যুবকের ভাই অভিযোগ করেন, গত ১৫ মে রাতে ৭/৮ জনের একটি মাদকচক্র তাঁর ভাইকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। নিহতের মায়ের দাবি, হত্যাকারীরা সবাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং এলাকায় তাদের প্রভাব রয়েছে। কোনো বড় ঘটনা ঘটলে কয়েকদিন অভিযান চলে, পরে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

গত এক বছরে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রায় তিনহাজার অভিযান পরিচালনা করে এক হাজার ২১০ জনকে গ্রেফতার করেছে। এ সময়ে ৯০৮টি মামলা দায়ের করা হয়। উদ্ধার করা হয়েছে ৫৫ হাজার পিস ইয়াবা, ২১৯ কেজি গাঁজা, ৪৬৬ বোতল ফেন্সিডিল, ১৯ গ্রাম ক্রিস্টাল আইসসহ বিপুল পরিমাণ মাদক। এরমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৫৫০ জনকে গ্রেফতার করেছে। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ আগেও একাধিকবার একই অপরাধে ধরা পড়েছিল। অন্যদিকে বিএমপি চারটি থানা এলাকায় ৬৬০ জনকে গ্রেফতার করে ৪৮৭টি মামলা করেছে। পুলিশও স্বীকার করছে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই রিপিট আসামি।

 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেড় বছরে বরিশাল অঞ্চলে ২ হাজার ৫৮৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৮২১টি মামলা এবং ৯১৭ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে এক হাজার ৯০৭টি অভিযানে ৬৪১টি মামলা হয়। উদ্ধার করা হয় ৭১ কেজির বেশি গাঁজা, ১৫ হাজার ৪৬৫ পিস ইয়াবা, শত শত অ্যাম্পুল নেশাজাতীয় ইনজেকশন, ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন মাদক। একই সময়ে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে নগদ অর্থ, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ৬৮২টি অভিযানে ১৮০টি মামলা এবং ২১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৩৩ কেজি ৭৪০ গ্রাম গাঁজা, তিন হাজার ৬১ পিস ইয়াবা, মরফিন, ইজিয়াম, সিডিল ও ফেনারেক্স ইনজেকশনসহ বিভিন্ন মাদক এবং প্রায় ১৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।

 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, বরিশালে গাঁজা ও ইয়াবাই প্রধান মাদক। নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হলেও একই ব্যক্তি বারবার ধরা পড়ছেন।
বিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার ও অপরাধ গবেষক মো. আব্দুল হান্নান বলেন, পুলিশের গবেষণায় দেখা গেছে দ্রুত এবং সহজে অধিক লাভের আশাতেই অনেকেই মাদক ব্যবসা ছাড়ছেন না। গ্রেফতারের ঝুঁকি জেনেও তারা এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “একজন ব্যক্তি বারবার মাদকসহ ধরা পড়ছে, তবুও পেশা ছাড়ছে না। দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগই এর মূল কারণ।”

 

এ বিষয়ে বিএমপি কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, “আমরা যাদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠাচ্ছি, তাদের একটি বড় অংশ কিছুদিন পরই বের হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। যুব সমাজকে রক্ষায় আমাদের বারবার অভিযান চালাতে হচ্ছে। বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।”

 

বরিশালের পিপি আবুল কালাম আজাদ বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রকৃত দখল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্প্রতি ৬৬ কেজি গাঁজার একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ঘর থেকে মাদক উদ্ধার হলেও তদন্ত প্রতিবেদনে কার দখল থেকে উদ্ধার হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে থাকা আগের একাধিক মাদক মামলার তথ্যও ফরওয়ার্ডিংয়ে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এসব দুর্বলতা জামিন শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

 

একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, বড় অভিযানে গ্রেফতার হলেও যদি তদন্ত নথিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন না করা হয়, তাহলে সেই ঘাটতির সুযোগ আসামিপক্ষ নিতে পারে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলায় এজাহারে তথ্যগত অসঙ্গতি, আসামির পরিচয়, প্রকৃত দখল এবং ঘটনার বর্ণনায় ত্রুটি ছিল। একটি মামলায় উদ্ধারকৃত মাদক আসামির কাছ থেকে নয়, আসামির পাশ থেকে পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আসামির দুগ্ধপোষ্য শিশু থাকার বিষয়টিও এজাহারে উল্লেখ ছিল। আরেকটি মামলায় আসামির পারিবারিক পরিচয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়। এসব অসঙ্গতি ও দুর্বলতাকে ভিত্তি করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, তদন্ত ও নথি প্রণয়নে অধিকতর নির্ভুলতা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করা না গেলে সহজ অর্থের প্রলোভনে অনেকেই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়বে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান বলেন, “সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে সচেতনতা ছাড়া শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়।”
বরিশালের বর্তমান বাস্তবতা বলছে, মাদকবিরোধী অভিযানের ঘাটতি নেই। তবে অভিযানের পাশাপাশি তদন্তের মান উন্নয়ন, এজাহার ও ফরওয়ার্ডিং আরও নির্ভুল করা, পূর্বের অপরাধের তথ্য যথাযথভাবে সংযুক্ত করা, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি এবং প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে একই ব্যক্তি বারবার আইনের ফাঁক গলে ফিরে আসবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অভিযান নয়, বরং প্রতিটি মামলার তদন্ত ও আইনি প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করা।