ঢাকাSunday , 8 November 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

৭ নভেম্বরের চেতনা: বিভাজন নয়, জাতীয় ঐক্যেই গড়ে উঠুক আগামীর বাংলাদেশ

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৯

আরিফ রহমান ::  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ, ঘটনাবহুল ও আলোচিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তার মধ্যে সেদিন সাধারণ সৈনিক ও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দেয়। দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, ঐতিহাসিক সেই ঘটনার অর্ধশতাব্দী পূর্তির প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক তাৎপর্য, জাতীয় সংহতির শিক্ষা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।

সংকটের পটভূমি: অস্থিরতার মুখে বাংলাদেশ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশে গভীর অস্থিরতা বিরাজ করছিল। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছিল নানা টানাপোড়েন। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। একই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। ঘটনাগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তোলে।

এ সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে বন্দি করে রাখা হয়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও বিভাজন ক্রমেই বাড়তে থাকে। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

৬ নভেম্বরের রাত, ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক পরিবর্তন

৬ নভেম্বর দিনগত রাতে ঢাকা সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহের সূচনা হয়। পরদিন ভোরে সেই বিদ্রোহ ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তনের রূপ নেয়। সৈনিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে রাজধানীর রাজপথে সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি।

এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত উপস্থিতি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের দিনে পরিণত করে।

তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে শুধু একজন সেনা কর্মকর্তার মুক্তি কিংবা একটি সামরিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাপ্তি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। বরং এটি ছিল সে সময়ের রাষ্ট্রীয় সংকট, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং জনগণের রাজনৈতিক প্রত্যাশার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।

সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতির প্রশ্ন

৭ নভেম্বরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো জাতীয় সংকটে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় নীতি ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার তার জনগণেরই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অপরিহার্য। ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ সেই সংহতির বিষয়টিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন

৭ নভেম্বরের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসেন এবং দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় বিভিন্ন পরিবর্তন আনেন।

তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি উদ্যোগের প্রসার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে। এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

তবে তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও ইতিহাসে নানা বিতর্ক, মূল্যায়ন ও ভিন্নমত রয়েছে। একটি পরিপূর্ণ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের জন্য এসব বিষয়কে তথ্য, যুক্তি ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বর্তমান বাংলাদেশে ৭ নভেম্বরের প্রাসঙ্গিকতা

২০২৬ সালের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ৭ নভেম্বরের শিক্ষা নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালীকরণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমাদের সামনে কিছু শিক্ষা রেখে যায়। ৭ নভেম্বরও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান অত্যন্ত জরুরি।

একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের মতামত, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার গুরুত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং জনগণের আস্থার ওপর।

ঐক্যের চেতনায় আগামীর বাংলাদেশ

৭ নভেম্বর কেবল অতীতের একটি রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনার স্মারক নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশের কঠিন সময়ে জনগণের ঐক্য, জাতীয় স্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষার প্রত্যয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আজ প্রয়োজন দলীয় সংকীর্ণতা, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, মানবিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু থাকবে না মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা; থাকবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, কিন্তু থাকবে না প্রতিহিংসা; থাকবে ক্ষমতার পরিবর্তন, কিন্তু দুর্বল হবে না রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

ইতিহাসকে শুধু উদ্‌যাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; ইতিহাসের শিক্ষা বাস্তব জীবনে ধারণ করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার ঐক্যের চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হোক আগামীর বাংলাদেশের অঙ্গীকার।

লেখক পরিচিতি:
আরিফ রহমান — কলামিস্ট, গবেষক ও বিশ্লেষক; আজীবন সদস্য, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম; আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি।