ঢাকাSaturday , 24 October 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দেশে কবে বন্ধ হবে প্রতিহিংসার রাজনীতি? ক্ষমতার পালাবদলে দল বদল নয়, বদল চাই রাজনীতির সংস্কৃতি

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬৪

!! আরিফ রহমান !!

 

দেশে কবে বন্ধ হবে প্রতিহিংসার রাজনীতি? ক্ষমতার পালাবদলে দল বদল নয়, বদল চাই রাজনীতির সংস্কৃতি ও জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন

বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি, সহ সব রাজনৈতিক দলের কাছে জনগণের প্রশ্ন—রাজনীতি কি ক্ষমতা দখল ও প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, নাকি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতার পর থেকে নানা সময়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। বদলেছে সরকার, বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণ, এসেছে নতুন প্রতিশ্রুতি, তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে—রাজনীতির এই পরিবর্তনের সুফল কতটা পৌঁছেছে মানুষের ঘরে? রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিহিংসা, দলীয় বিদ্বেষ, হামলা-মামলা, সহিংসতা এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের বাইরে গিয়ে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করার রাজনীতি কবে প্রতিষ্ঠিত হবে?

একটি দেশের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ, রাষ্ট্রের উন্নয়ন, আইনের শাসন, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সংকট হলো—প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা। ক্ষমতায় থাকা দল বিরোধী পক্ষকে কোণঠাসা করতে চায়, বিরোধী পক্ষ ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইয়ে নামে। আর ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও আতঙ্ক।

এই সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশ কবে বেরিয়ে আসবে? কবে রাজনীতি হবে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যম? কবে রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্ষমতার হিসাবের পাশাপাশি বাজারে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, মাছ, মাংস ও সবজির দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তাকে নিজেদের প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে বিবেচনা করবেন? কবে বন্ধ হবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রতিপক্ষকে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সহিংসতার আশঙ্কা?

এসব প্রশ্ন আজ শুধু রাজনৈতিক সচেতন মানুষের নয়; বরং কর্মজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, দিনমজুর, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও মধ্যবিত্ত পরিবারেরও।

ক্ষমতার পালাবদল হবে, কিন্তু কেন বদলাবে না জনগণের নিরাপত্তা ?

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি এবং বামপন্থী ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, কর্মসূচি ও সমর্থকগোষ্ঠী। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এসব দলের প্রত্যেকেরই আইনসম্মতভাবে রাজনীতি করার সুযোগ, মতপ্রকাশের অধিকার এবং জনগণের সমর্থন চাওয়ার অধিকার থাকা প্রয়োজন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কি জনগণের ভোট, জনসমর্থন, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও জনসেবার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, নাকি প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা, কোণঠাসা করা কিংবা রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে?

বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় পড়বেন—এমন আশঙ্কা যদি তৈরি হয়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যদি একই ধরনের ভয় কাজ করে, কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে ভিন্নমতের মানুষ নিজেদের অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, তাহলে সেটি কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না। এসব আশঙ্কা যেখানে বাস্তব ঘটনা বা অভিযোগের ভিত্তিতে দেখা দেয়, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

একইভাবে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপি, বামপন্থী দল কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কোনো দলই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে নয়; আবার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শুধু ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হওয়ার কারণে অধিকার হারাতে পারে না।

রাজনীতির মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, তর্ক থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে, কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ থাকবে। কিন্তু সেই বিরোধ যেন প্রতিহিংসা, সহিংসতা, বেআইনি হয়রানি কিংবা নাগরিক অধিকার হরণের কারণ না হয়—সেটি নিশ্চিত করাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

একটি রাজনৈতিক দলকে অন্য দলকে নিশ্চিহ্ন করে নয়, বরং জনগণের আস্থা অর্জন করে এগিয়ে যেতে হবে। জনগণ যে দলকে গ্রহণ করবে, নির্বাচনের মাধ্যমে সেই দল সরকার গঠন করবে। আর জনগণ যে দলকে প্রত্যাখ্যান করবে, সেই দলের দায়িত্ব হবে জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের জন্য নিজেদের নীতি, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক দুর্বলতা পর্যালোচনা করা। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—ক্ষমতা স্থায়ী কোনো ব্যক্তির বা দলের সম্পত্তি নয়; ক্ষমতা জনগণের দেওয়া দায়িত্ব।

রাজনীতি কি শুধু ক্ষমতার হিসাব, নাকি মানুষের পেটের ভাতের নিশ্চয়তা ?

রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বড় বড় প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। উন্নয়নের কথা বলা হয়, অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও জীবনমান উন্নয়নের অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু দিন শেষে একজন নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—তিনি সারা দিনের উপার্জন দিয়ে পরিবারের খাবার কিনতে পারছেন কি না।

একজন রিকশাচালক সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে যে অর্থ আয় করেন, তা দিয়ে বাড়িভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ মেটানো কতটা সম্ভব? একজন দিনমজুর কাজ না পেলে তাঁর পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা কীভাবে হবে? একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীর বেতন ও পণ্যের খরচ সামলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখবেন কীভাবে? একজন কৃষক উৎপাদন খরচের ন্যায্য মূল্য পাবেন কি না? একজন শিক্ষিত তরুণ চাকরি না পেয়ে কত দিন পরিবারের ওপর নির্ভরশীল থাকবেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া উন্নয়নের আলোচনা পূর্ণতা পায় না।

একটি পরিবারের আয় যদি সীমিত হয়, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত তার নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণের পরিসংখ্যান দিয়ে সেই পরিবারের সংকট বোঝানো সম্ভব নয়। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নির্বাচনী ইশতেহারে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। শুধু কতটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে, তা নয়; বরং একটি নিম্ন আয়ের পরিবার কীভাবে মাসের খরচ মেটাবে, একজন বেকার তরুণ কীভাবে কাজ পাবেন, কৃষক কীভাবে ন্যায্য দাম পাবেন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কীভাবে সহজ শর্তে অর্থায়ন পাবেন—এসব বিষয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে।

রাজনীতির সাফল্য শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতির প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন সাধারণ মানুষের জীবন আগের চেয়ে নিরাপদ, স্বচ্ছল ও মর্যাদাপূর্ণ হয়।

বিএনপির কাছে প্রত্যাশা: প্রতিহিংসা নয়, আইনের শাসন ,অর্থনৈতিক মুক্তি,জনগণের ভাগ্যউন্নয়ন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। দলটির কাছে জনগণের প্রত্যাশা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে তারা যেন আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি হতে হবে আইনানুগ প্রক্রিয়ায়। অপরাধের দায় ব্যক্তির, পুরো রাজনৈতিক পরিচয় বহনকারী জনগোষ্ঠীর নয়। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তদন্ত ও বিচার হবে; কিন্তু সেই অভিযোগের অজুহাতে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানি, হামলা কিংবা অধিকারবঞ্চনার শিকার না হন।

বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবেন। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশাও থাকবে।

ক্ষমতায় যাওয়া যেমন রাজনৈতিক অর্জন, তেমনি ক্ষমতায় থেকে ভিন্নমতের অধিকার রক্ষা করা একটি বড় গণতান্ত্রিক পরীক্ষা। বিএনপি সেই পরীক্ষায় কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে তাদের নীতি, সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক আচরণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহির ওপর।

আওয়ামী লীগের প্রতিও একই প্রশ্ন: রাজনৈতিক অধিকার কি সবার জন্য?

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিচালনা করেছে। দলটির ইতিহাস, রাজনৈতিক অবদান, শাসনকাল ও বিতর্ক নিয়ে দেশে নানা মত রয়েছে। কিন্তু দলটির প্রতি যে প্রশ্ন প্রযোজ্য, তা অন্য সব দলের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য—রাজনৈতিক বিরোধিতার অধিকার কতটা সম্মান করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষ ছিল এবং নাগরিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত ছিল?

যে কোনো রাজনৈতিক দলের শাসনামল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উন্নয়ন, অর্থনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও আইনের শাসন—সব বিষয়ই বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু দলীয় সমর্থন কিংবা বিরোধিতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করা যায় না।

আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক ক্ষমতা কখনোই স্থায়ী নয়। জনগণের সমর্থন পরিবর্তিত হতে পারে, নির্বাচনী ফলাফল বদলাতে পারে এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন রূপ নিতে পারে। তাই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের অধিকার রক্ষা করা কেবল বিরোধী দলের দাবি নয়; এটি ভবিষ্যতে নিজের অধিকার সুরক্ষিত রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা, কাউকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া কিংবা শুধু দলীয় পরিচয়ের কারণে নাগরিক অধিকার সংকুচিত করার মতো ধারণা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিকল্প হতে পারে না। আইনসম্মত ব্যবস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি ও অন্যান্য দলেরও দায় রয়েছে

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছেও জনগণের প্রত্যাশা একই।

গণতন্ত্রে প্রত্যেক দলের অধিকার আছে নিজেদের আদর্শ তুলে ধরার, জনগণের সমর্থন চাওয়ার এবং নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার চেষ্টা করার। কিন্তু কোনো দলই শুধু ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর জন্য রাজনীতি করতে পারে না। তাদের প্রত্যেককে দেখাতে হবে, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে কীভাবে অর্থনীতি শক্তিশালী করবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে, দুর্নীতি কমাবে, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা রক্ষা করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।

যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তার সরকার যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি না করে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ, মতপ্রকাশ, সংগঠন পরিচালনা ও আইনসম্মত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার রক্ষা করতে হবে। একইভাবে বিরোধী দলগুলোরও দায়িত্ব থাকবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, যুক্তিনির্ভর সমালোচনা এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

শুধু সরকারকে দায়ী করলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আসবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও সহনশীলতা, শৃঙ্খলা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।

প্রতিহিংসার রাজনীতি দেশের অর্থনীতিকেও দুর্বল করে

রাজনৈতিক সংঘাত শুধু মানুষের প্রাণহানি, আহত হওয়া কিংবা সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্রমিকের আয় কমে যায়। পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হলে কৃষকের পণ্য বাজারে পৌঁছাতে সমস্যা হয়। বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়লে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়। আর সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় কাজেও নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন।

একটি দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হলে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন, নির্ভরযোগ্য আইনব্যবস্থা এবং নীতির ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু প্রতিপক্ষ নয়; ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করেন সাধারণ মানুষ। যে শ্রমিকের দিনের আয় বন্ধ হয়ে যায়, যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান খোলা সম্ভব হয় না, যে পরিবারের চিকিৎসা বা শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যায়—তাদের কাছে রাজনৈতিক সংঘাত কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি সরাসরি জীবিকার সংকট।

বাজারে স্বস্তি ফেরানোই হোক রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য

দেশের সাধারণ মানুষ প্রতিদিন বাজারের হিসাব করেন। মাসের শুরুতে বেতন বা আয় হাতে পাওয়ার পর বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস, পরিবহন, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং খাবারের খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কে কাকে হারাবে, কে কার বিরুদ্ধে কত কঠোর বক্তব্য দেবে—এসব আলোচনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত বাজারে স্বস্তি ফেরানোর কার্যকর পরিকল্পনা।

সরকারের দায়িত্ব হলো সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, বাজারে অযৌক্তিক কারসাজি ও প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, কৃষিপণ্যের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যয় কমানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।

রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ে বক্তব্য দিলেই চলবে না; বরং তারা কীভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমাবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।

একজন দিনমজুর যেন সারাদিন কাজ করে পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কিনতে পারেন, একজন কৃষক যেন উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পান, একজন শিক্ষিত তরুণ যেন যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান এবং একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যেন হয়রানি ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন—এই লক্ষ্যগুলোই হওয়া উচিত জনকল্যাণমূলক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবতে হবে

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় সম্পদ। তাদের মেধা, শ্রম, উদ্ভাবনী শক্তি ও কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ দুর্বল হলে, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত থাকলে কিংবা নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

সরকারি চাকরি সীমিত; তাই শুধু চাকরির প্রতিশ্রুতি নয়, বেসরকারি খাতে নতুন কাজ সৃষ্টি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, প্রযুক্তি, সেবা খাত ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিকাশের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তরুণদের রাজনৈতিক সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে দেশের উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তাদের ভবিষ্যৎ যেন রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

দুর্নীতি ও দলীয়করণ বন্ধ না হলে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না

দেশের উন্নয়নের জন্য সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছ দরপত্র, কার্যকর নিরীক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিশেষ সুবিধা পেলে কিংবা অনিয়মের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পেলে জনগণের আস্থা দুর্বল হয়।

বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপি এবং অন্যান্য দলের কাছে জনগণের প্রত্যাশা—তারা যেন নিজেদের দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহির পক্ষে অবস্থান নেয়।

দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা যাবে না, আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে তদন্তের বাইরে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের প্রয়োগ হতে হবে প্রমাণ ও যথাযথ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।

উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অপচয় হলে তার ক্ষতি বহন করেন করদাতা ও সাধারণ নাগরিকেরা। সরকারি সেবায় অনিয়ম হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন দরিদ্র মানুষ। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

রাজনৈতিক সহনশীলতা দুর্বলতা নয়, গণতন্ত্রের শক্তি

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় আপোস, আলোচনা ও সমঝোতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ গণতন্ত্রের শক্তি হলো—ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সবাই রাষ্ট্রের অভিন্ন স্বার্থে কাজ করতে পারে।

একটি দেশের সব রাজনৈতিক দল একমত হবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো মৌলিক বিষয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব।

সংসদে বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে, সরকারের ভুল তুলে ধরবে এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব করবে। সরকারও বিরোধী দলের যুক্তিসংগত প্রস্তাব বিবেচনা করবে। রাজপথে কর্মসূচি থাকবে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা রক্ষার দায়িত্বও পালন করতে হবে।

একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রে বিরোধী দলের অস্তিত্ব সরকারের জন্য হুমকি নয়; বরং সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। একইভাবে সরকারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করলেই বিরোধী দলের সব বক্তব্য সঠিক হয়ে যায় না। যুক্তি, তথ্য, নীতি ও জনস্বার্থের ভিত্তিতেই রাজনৈতিক বিতর্ক হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার হতে হবে নিরপেক্ষভাবে

মারামারি, হামলা, ভাঙচুর, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বেআইনি আটক কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নির্যাতনের অভিযোগ—যে পক্ষের বিরুদ্ধেই উঠুক, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ নিষ্পত্তি প্রয়োজন।

কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী অপরাধে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি করা হলে তার প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারব্যবস্থা যেন প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

রাজনৈতিক নেতাদেরও নিজেদের কর্মীদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—দলীয় পরিচয় কাউকে অপরাধের অনুমতি দেয় না। প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো, সহিংসতার উসকানি দেওয়া কিংবা আইনের বাইরে গিয়ে শক্তি প্রদর্শন কোনো রাজনৈতিক অর্জন নয়।

যে রাজনীতি মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলে, জীবিকা ধ্বংস করে এবং সমাজে স্থায়ী বিভাজন তৈরি করে, সেই রাজনীতি কখনো টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

রাষ্ট্র কোনো একক দলের নয়, রাষ্ট্র সবার

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। দেশের নাগরিকেরা রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্ম, পেশা, অঞ্চল ও সামাজিক পরিচয়ে ভিন্ন হতে পারেন; কিন্তু নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ও মর্যাদা সমানভাবে সুরক্ষিত থাকা প্রয়োজন।

যে ব্যক্তি বিএনপিকে সমর্থন করেন, তিনি যেমন বাংলাদেশের নাগরিক; আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপি কিংবা অন্য কোনো দলের সমর্থকও তেমনি এই দেশের নাগরিক। আর কোনো দলকে সমর্থন না করা মানুষের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

দেশের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সেই মতভেদ যেন প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক সম্প্রীতি কিংবা নাগরিক নিরাপত্তা ধ্বংস না করে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হলো বিভাজনের দেয়াল আরও উঁচু করা নয়; বরং ন্যায্যতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে সেই দেয়াল কমিয়ে আনা।

পরিবর্তন চাই—কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে মানুষের জীবনে

বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন চায়, নিরাপত্তা চায়, কর্মসংস্থান চায়, ন্যায়বিচার চায় এবং একটি সম্মানজনক জীবন চায়। তারা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতা ও আইনের ভিত্তিতে মানুষের মূল্যায়ন হবে।

তারা চায় এমন বাজারব্যবস্থা, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য প্রতিদিন অনিশ্চয়তায় পড়তে হবে না। তারা চায় এমন শিক্ষা, যা সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। তারা চায় এমন চিকিৎসাব্যবস্থা, যেখানে অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হবে না। তারা চায় এমন কর্মসংস্থান, যেখানে পরিশ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্য পাওয়া যাবে।

এসব প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক বক্তব্যের বাইরে এসে সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দিতে হবে। তাদের দেখাতে হবে—কীভাবে উৎপাদন বাড়বে, কীভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কীভাবে দুর্নীতি কমবে, কীভাবে প্রশাসনিক সেবা সহজ হবে এবং কীভাবে দেশের সম্পদের সুফল আরও ন্যায্যভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে।

উন্নয়নের নামে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য ফলাফল। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন হওয়া উচিত—এতে মানুষের কী উপকার হলো, কত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কতটা জনসেবা উন্নত হলো এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের কতটা কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হলো।

এখনই সময় রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে বাস্তব অঙ্গীকার প্রয়োজন।

প্রথমত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চিন্তা পরিহার করে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতাকে সম্মান করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক যেন বেআইনি হয়রানি, হামলা বা বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।

পঞ্চমত, দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ষষ্ঠত, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থবহ আলোচনা গড়ে তুলতে হবে।

সপ্তমত, তরুণদের রাজনৈতিক সহিংসতার পথে ঠেলে না দিয়ে শিক্ষা, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে যুক্ত করতে হবে।

এই পরিবর্তন কোনো একটি দলের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার, বিরোধী দল, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তবে পরিবর্তনের প্রথম দায়িত্ব অবশ্যই রাজনৈতিক নেতৃত্বের। কারণ তাদের বক্তব্য, আচরণ ও সিদ্ধান্ত সমাজের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

শেষ কথা: রাজনীতি হোক মানুষের, প্রতিহিংসার নয়

বাংলাদেশে কবে বন্ধ হবে প্রতিহিংসার রাজনীতি? কবে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল আর সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের কারণ হবে না? কবে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা বুঝবেন—প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা নয়, জনগণের জীবনমান উন্নত করাই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তৃতায় দেওয়া সম্ভব নয়। উত্তর দিতে হবে রাজনৈতিক আচরণে, রাষ্ট্র পরিচালনায়, আইনের প্রয়োগে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনে।

যে দেশে মানুষ নিরাপদে কাজ করতে পারে, ব্যবসায়ী নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, কৃষক ন্যায্য মূল্য পান, তরুণেরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, পরিবারগুলো সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারে এবং ভিন্নমতের মানুষও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে—সেই দেশই প্রকৃত অর্থে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়।

রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে গণতান্ত্রিক নিয়মে, অপরাধের বিচার হবে আইনের ভিত্তিতে, মতপার্থক্যের সমাধান হবে আলোচনায় এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে সাধারণ মানুষের ঘরে।

রাজনীতি কোনো ব্যক্তির প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চ নয়, কোনো দলের স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উপায় নয়, কিংবা প্রতিপক্ষকে দেশছাড়া করার কর্মসূচিও নয়। রাজনীতি হলো জনগণের দেওয়া দায়িত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক অঙ্গীকার এবং মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বাংলাদেশের মানুষ আর সংঘাতের রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা চায় শান্তি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী বাজার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। তারা চায়, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রশ্নে যেন কোনো ছাড় না থাকে।

বন্ধ হোক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। বন্ধ হোক সহিংসতা ও রক্তপাত। প্রতিষ্ঠিত হোক আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও জবাবদিহি। রাজনীতি হোক সাধারণ মানুষের কল্যাণে, দেশের অর্থনৈতিক মুক্তিতে এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণে।

কারণ, ক্ষমতা নয়—মানুষই রাষ্ট্রের মূল শক্তি। দল নয়—দেশই সবার আগে। আর প্রতিহিংসা নয়—উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাই হোক বাংলাদেশের রাজনীতির প্রকৃত পরিচয়।

 

আরিফ রহমান -লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক,, আজীবন সদস্য জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, সিনিয়র সাব এডিটর সিটিজেন টাইমস, আজীবন সদস্য বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। প্রয়োজনে – ০১৭১১৭৮৩৬৭৮