ঢাকামঙ্গলবার , ৫ মে ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতায় বেড়ে চলছে ধান্দাবাজদের আধিপত্য

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
মে ৫, ২০২৬ ৫:৪৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৪৫

নিজস্ব প্রতিবেদক :: রাজনীতি একটি মহান ব্রত হলেও একে অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করে এক শ্রেণির মানুষের ধান্দাবাজির বিষয়টি নতুন নয়। একটা সময় ছিল, দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার আদর্শ নিয়েই সবাই রাজনীতিতে নাম লেখাতেন। তখন রাজনীতি ছিল শুধুই দেওয়ার; পাওয়ার আশা কেউ তেমন করতেন না। রাজনীতিতে এসে সর্বস্বান্ত হয়েছেন এমন নজিরও আমাদের দেশে অনেক। দেশ ও জনসেবা মুখ্য উদ্দেশ্য হলেও রাজনীতি যারা করেন তারা একেবারেই কিছু পাওয়ার আশা করেন না, এমনটি নয়। যারা সৎ রাজনীতিক, তারা চান সম্মান ও রাষ্ট্রক্ষমতা। রাজনীতিকদের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার ইচ্ছা বা লক্ষ্যকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার অবকাশ নেই। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পাওয়ার জন্যই তারা নিরন্তর সংগ্রাম করেন; জেল-জুলুম-হুলিয়া মাথায় নিয়ে কাজ করেন। তবে সে ক্ষমতাকে তারা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর কথাই ভাবেন।

একটি রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তখন এর চারপাশে অনেক তল্পিবাহক-চাটুকার ভিড় করে। ক্ষমতাসীন দলটিকে সমর্থন-সহযোগিতার নামে তারা নানা ধরনের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ পরিচালনায় তৎপর হয়। আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক দলেরই অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন রয়েছে। এগুলো মূল দলের অনুমোদনপ্রাপ্ত। যেমন বিএনপি অনুমোদিত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন রয়েছে ১১টি। অঙ্গ সংগঠনগুলো হলো- যুবদল, কৃষক দল, মহিলা দল, ওলামা দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও জাসাস। আর শ্রমিক দল ও ছাত্রদল সহযোগী সংগঠন হিসেবে রয়েছে। কিন্তু ইদানীং দলেই অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বাইরে নানা কিসিমের সংগঠনের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব সংগঠনের নেতা-পাতিনেতারা অতিশয় প্রভাবশালী ও দাপুটে। ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়’ বলে যে প্রবাদ রয়েছে, এদের ক্ষেত্রে তা শতভাগ প্রযোজ্য। দল ক্ষমতায় থাকলে এরা ওইসব সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে সরকারি দপ্তরে তদবির করে, টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি করে, এমনকি প্রতারণাও করে। রাজনৈতিক দলগুলো এসব জানে না, এমনটি নয়। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এসব ধান্দাবাজের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এর অবশ্য ‘অনিবার্য’ কারণও রয়েছে। আর সে কারণটি হলো দলের না হলেও দলীয় কোনো না কোনো নেতার আশীর্বাদ এদের মাথার ওপর থাকে। অতি সম্প্রতি এ ধরনের একটি ধান্দাবাজ সংগঠনকে নিয়ে কথা উঠেছে।

তদবির-চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে এসব ভুঁইফোঁড় সংগঠন।’নাম দিয়ে যায় চেনা’ বলে যে কথাটি বাংলায় প্রচলিত, সে সূত্র অনুযায়ী নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না এসব সংগঠনের উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যটা কী। উল্লেখ্য, এসব ভুঁইফোঁড় সংগঠন মাঝেমধ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভার আয়োজন করে। ওইসব অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা-আয়োজকরা আবার বড় বড় নেতাকে অতিথি-প্রধান অতিথি হিসেবে পেয়েও যান। এ কর্মকাণ্ডের দ্বারা তারা দু’ভাবে লাভবান হন। এক. বড় নেতার সঙ্গে ছবি তুলে নিজেদের বাজারদরটা বাড়ানো যায়। দুই. অনুষ্ঠানের ‘খরচাপাতি’র নামে চাঁদাবাজিটাও ভালো চলে। আর আমাদের সমাজে টাকা দিয়ে এসব সংগঠনের উপদেষ্টা হতে কিংবা বিশেষ অতিথির আসনে বসার জন্য উদগ্রীব মানুষের অভাব নেই।
একাধিকবার ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকারি দল বিএনপির অবস্থাও এর চেয়ে আলাদা কিছু নয়। দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তালিকা ওপরে উল্লেখ করেছি। এর বাইরেও রয়েছে হরেক কিসিমের সংগঠন। কোনোটির নামের আগে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটি, কোনোটির নামের সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে জিয়া-খালেদা জিয়ার নাম। এমনকি তারেক রহমানের নামেও রয়েছে কয়েকটি সংগঠন। বলা বাহুল্য, এসব সংগঠন যারা তৈরি করেছেন, তাদের উদ্দেশ্যও আওয়ামী লীগের ধান্দাবাজদের থেকে ভিন্ন কিছু নয়। পার্থক্য এক জায়গায়। ক্ষমতায় আছে, ক্ষমতায় নেই,। তবে সংগঠনের উদ্যোগে সভা কিংবা মানববন্ধনের নামে দলীয় পয়সাওয়ালা নেতাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ব্যবসাটা বেশ ভালোই চলে। এখানেও কেন্দ্রীয় অনেক নেতা ওইসব সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক কিংবা প্রধান উপদেষ্টার পদ অলঙ্কৃত করে ধন্য হন।
রাজনীতি ও রাজনীতিকদের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য এই জগতের লোকগুলোই দায়ী। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে নানা ফন্দি-ফিকির করে ধান্দাবাজ-ফেরেববাজরা ঢুকে পড়েছে এ অঙ্গনে। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য একদিকে নিজ নিজ দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে, অন্যদিকে গোটা রাজনীতিকেই দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আসামির কাঠগড়ায়। অথচ এ রাজনীতিই আমাদের এনে দিয়েছে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ, একটি নিজস্ব পতাকা ও জাতিগত পরিচয়। কিন্তু এক শ্রেণির কীটপতঙ্গ রাজনীতির সে সবুজ মাঠকে বিবর্ণ করে দিচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এসব কীটপতঙ্গের হাত থেকে রাজনীতিকে বাঁচাতে দরকার কার্যকর কীটনাশক। আর তা প্রয়োগ করতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই।

আরিফ রহমান – লেখক ও গবেষক।