
নিজস্ব প্রতিবেদক :: সময়টাই এখন তেলের, চারদিকে শুধু তেল আর তেল।
তেল আছে বলে জীবন আছে। তেল ফুরিয়ে গেলে জীবনপ্রদীপও নিভে যায়। আর তাই সমাজে তেল মারা লোকের অভাব নেই। কে, কাকে কতটুকু তেল মেরে নিজের অবস্থা পাকাপোক্ত করবে, স্বার্থসিদ্ধি করবে, নেক নজরে আসবে, তা নিয়ে ব্যস্ত সবাই।
সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো—যাকে তেল মারা হয় অর্থাত্ তোষামোদ করা হয়, সেও এতে খুব খুশি হয়। এ ধরনের তেলপ্রেমীদের কারণেই একটা দেশ, একটা সমাজ, একটা সম্প্রদায়, একটা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়। এটা নিয়ে কারো হুঁশ নেই।
বর্তমানে বাঙালি মানেই—উচিত কথা বললে মুখ কালো আর তেল দিতে পারলে খুব ভালো। তেল মারা প্রসঙ্গে একজন তেলবিশারদ লেখক বলেছেন, ‘তিলে তেল হয়, কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা, তেলা মাথায় তেল দেওয়া। এক তেল নিয়ে কম রঙ্গ হয়নি এই বঙ্গে। এখনো যে হচ্ছে না, তা নয়। হচ্ছে এবং আগের চেয়ে বেশিই হচ্ছে। তবে তেল এখন শুধু আর রঙ্গ নয়, এটি আমাদের দেহ ও সমাজের একটি অঙ্গ। সময়টাই এখন তেলের। চারদিকে শুধু তেল, তেল আর তেল। একটু ভালোভাবে তাকালেই দেখা যায় সবার গা থেকে এখন ঘাম নয়, ফোঁটায় ফোঁটায় তেল ঝরছে। আমরা সবাই এখন একেকটি তেলের বিশাল বিশাল আধার। আর কিছু নয়, সর্বোত্কৃষ্ট জায়গায় কীভাবে এ তেলের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়, তা জানার জন্যই আমরা সবাই এখন হন্যে হয়ে ছুটছি। তেল মারতে মারতে একেক জনের গায়ের চামড়া তুলে ফেললেও আমরা ক্ষান্ত হই না। উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়া পর্যন্ত খুঁজতে থাকি আর কাকে তেল মারা যায়। বর্তমানে তৈলবিদ্যা যে যত বেশি আয়ত্ব করতে পারি জীবনে সে ততটাই উন্নতি করি। আমরা বিশ্বাস করতে শিখি তেলহীন বিদ্যা ফুটো পয়সার মতোই অচল।
যারা বুক চিতিয়ে জোর গলায় বলেন, আমি তেল পছন্দ করি না, তেল মারতে পারি না—তারা আসলে সত্য বলেন না। আসল ব্যাপার হলো, তিনি তেল মারা খুবই পছন্দ করেন, গোপনে তিনি তেল ঠিকই মাখেন, কিন্তু অন্যের তুলনায় তা যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয় না। কিংবা কোনো কারণে তেলে কাজ হয় না। তেলে কাজ না হলে আমরা খামোখাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠি। তেলের ওপর ঝাঁঝ মেটাই। তেল-দাতাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করি। তেল মারতে পারি না বা তেল মারা পছন্দ করি না—এ কথা বলা আসলে তেল মারার সুযোগ না পাওয়া বা তেল মেরেও কাজ না হওয়ার ব্যর্থতাজনিত ক্ষোভ বা রোষ। এটা আমাদের বুঝতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে। কাজেই মুখে যে যা-ই বলি, আসলে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি তেলবাজ। দক্ষতা আর কার্যকারিতার ঘাটতি থাকতে পারে। তাই বলে তেল-বিমুখ কেউই নই।
বর্তমান জামানায় তেল ছাড়া সবকিছু অচল। তেল আছে তো সব আছে, তেল নেই তো কিছু নেই। তেল ছাড়া কোনো কাজ হয় না।
চিকিত্সা-বিজ্ঞান বলে, বেশি তেল খাওয়া স্বাস্থ্যের করে ক্ষতি। আর অভিজ্ঞতা-বিজ্ঞান বলে, বেশি তেল মারা আনে সফলতা ও উন্নতি! বর্তমানে তেলবাজি ছাড়া সমাজ চলে না। রাষ্ট্র চলে না। যোগ্যতার তেমন কোনো মূল্য নেই। কে কত বেশি তেল দিতে পারেন তাই এখন যোগ্যতার মাপকাঠি। আমাদের দেশে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও শাসকেরা তেলবাজিকে বড়ো বেশি মূল্য দেন। সামনে যেতে হলে একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে তেলবাজি। ব্যবসা, বাণিজ্য, নেতৃত্ব, পোস্টিং, প্রমোশন এসবই তেলবাজির বৃত্তে আটকে গেছে।
লেখক ও গবেষক
আরিফ রহমান

