
আরিফ রহমান :: বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ, হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একসময় সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকতা ছিল সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। গণমানুষের আস্থা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম ছিল এই পেশা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই মর্যাদাপূর্ণ পেশাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বিশেষ করে বরিশালের সাংবাদিক মহলের একটি অংশের বিরুদ্ধে উঠেছে তীব্র সমালোচনা। অভিযোগ রয়েছে—এখন আর সাংবাদিক হতে প্রয়োজন হয় না কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা কিংবা লেখালেখির দক্ষতা। বরং বড় কোনো সাংবাদিক নেতা, পত্রিকার সম্পাদক কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত অনুগত হয়ে ওঠা, তোষামোদ করা এবং সুবিধাবাদী সম্পর্ক গড়ে তোলাই যেন সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার অন্যতম প্রধান “যোগ্যতা” হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, বর্তমানে বরিশালে অনেক মেধাবী, শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ রয়েছেন, যারা সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে সচেতন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় আগ্রহী এবং মানসম্পন্ন লেখা তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু বিভিন্ন গোষ্ঠীস্বার্থ, তেলবাজি ও চামচামির সংস্কৃতির কারণে তারা মূলধারার সাংবাদিকতায় জায়গা পাচ্ছেন না। বরং যেসব ব্যক্তি সাংবাদিক নেতাদের খুশি রাখতে পারেন, ব্যক্তিগত কাজকর্ম করেন কিংবা অন্ধ অনুসারীর মতো তোষামোদে ব্যস্ত থাকেন—তারাই রাতারাতি “বড় সাংবাদিক” বনে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বরিশালের কিছু সাংবাদিক নেতা নিজেদের অনুসারী ও সুবিধাভোগীদেরই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। কে কত বেশি তেল দিতে পারবে, কে কত বেশি চামচামি করবে—সেটিই যেন অনেক ক্ষেত্রে মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি কোনো ব্যক্তি নানা অপকর্ম, অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলেও, যদি সে কোনো প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতার ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে কিংবা নীরবে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাংবাদিক অঙ্গনে এক ধরনের “চামচাদের রাজত্ব” তৈরি হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক প্রকৃত সংবাদকর্মী।
এমন পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে পড়ছেন প্রকৃত সাংবাদিক ও লেখকরা। তাদের মতে, সাংবাদিকতার মতো দায়িত্বশীল পেশা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ, দালালি ও তোষামোদ নির্ভর হয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। কারণ সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে প্রকৃত সাংবাদিক ও নামধারী সুবিধাবাদীদের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়। এতে সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা ক্ষয় হতে থাকে।
অনেক প্রবীণ সাংবাদিকের ভাষ্য, “একসময় মানুষ বিশ্বাস করত—খবরের কাগজে যা প্রকাশিত হয়, তা সত্য। সাংবাদিক মানেই ছিলেন সাহসী, নির্ভীক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি। কিন্তু বর্তমানে কিছু নামধারী ও অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ায় পুরো পেশাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।”
তাদের অভিযোগ, এসব তথাকথিত সাংবাদিক এমন এক নেতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করছেন, যেখানে প্রকৃত সাংবাদিকরাও মানুষের সন্দেহের মুখে পড়ছেন। যারা দিনরাত পরিশ্রম করে মাঠে কাজ করেন, তথ্য যাচাই করেন, জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করেন এবং নানা ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরেন—তারাই আজ সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়ন ও বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।
সচেতন মহল মনে করছে, সাংবাদিকতা পেশাকে কলঙ্কমুক্ত করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা, পরিচয়পত্র ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, এবং সাংবাদিকতার ন্যূনতম নৈতিক ও পেশাগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা। পাশাপাশি প্রকৃত ও মেধাবী সংবাদকর্মীদের মূল্যায়ন এবং ভুয়া ও সুবিধাবাদী সাংবাদিকদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল সামাজিক অঙ্গীকার। সত্য তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠাই সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য। তাই এই পেশাকে বাঁচাতে হলে তেলবাজি, অপসাংবাদিকতা ও ব্যক্তিস্বার্থের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যোগ্যতা, সততা ও পেশাদারিত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রত্যাশা—বরিশালসহ সারাদেশে সাংবাদিকতা আবারও তার হারানো মর্যাদা ফিরে পাক। প্রকৃত সাংবাদিকরা যেন সম্মান পান, আর ভুয়া ও সুবিধাবাদীরা মুখোশ খুলে সমাজের সামনে উন্মোচিত হন। তাহলেই হয়তো আবারও মানুষ বিশ্বাস করতে পারবে—সত্যের পক্ষে এখনও কিছু সাহসী কলম বেঁচে আছে।

