ঢাকাSaturday , 22 August 2026
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিশুর আনন্দ হোক নিরাপদ: সাময়িক বিনোদনের আড়ালে স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়

Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....
৬২

আরিফ রহমান :: শিশুর আনন্দ হোক নিরাপদ: সাময়িক বিনোদনের আড়ালে স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়।

শিশু মানেই আনন্দ, খেলাধুলা, কৌতূহল আর নতুন কিছু শেখার সময়। ছুটির দিনে সন্তানকে নিয়ে রেস্টুরেন্ট, শপিং মল কিংবা ইনডোর কিডস জোনে ঘুরতে যাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের। তবে বিনোদনের পাশাপাশি শিশুর স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, খাবার ও স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি।

কারণ শিশুর সুস্থ বিকাশ শুধু দামি খেলনা বা আকর্ষণীয় বিনোদনের ওপর নির্ভর করে না; বরং পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, শারীরিক খেলাধুলা, পারিবারিক সময় এবং নিরাপদ পরিবেশ—সবকিছু মিলেই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ শৈশব।

কিডস জোনে আনন্দের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাও জরুরি

ইনডোর কিডস জোনে বল পিট, স্লাইড, প্লাস্টিকের খেলনা ও বিভিন্ন রাইড থাকে। একই খেলনা প্রতিদিন অনেক শিশু ব্যবহার করে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত না করলে এসব জায়গায় জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

শিশুরা খেলতে গিয়ে খেলনা মুখে দিতে পারে, হাত দিয়ে মুখ-চোখ স্পর্শ করতে পারে। ফলে অপরিষ্কার পরিবেশে বিভিন্ন সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে।

তাই সন্তানকে কিডস জোনে দেওয়ার আগে অভিভাবকদের দেখা উচিত—খেলনার পরিচ্ছন্নতা কেমন, কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিষ্কার করে কি না এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা রয়েছে কি না।

খেলা শেষে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে দেওয়া উচিত। একইভাবে কাশি, জ্বর, ডায়রিয়া বা অন্য কোনো সংক্রামক অসুস্থতা থাকলে শিশুকে জনসমাগমপূর্ণ খেলার জায়গায় না নেওয়াই ভালো।

রঙিন খাবার নয়, প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার

রেস্টুরেন্ট বা ঘোরাঘুরির সময় শিশুদের হাতে চকলেট, ললিপপ, ক্যান্ডি, কোমল পানীয় কিংবা নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাবার তুলে দেওয়া খুব সহজ। মাঝে মাঝে এসব খাবার খাওয়া বড় সমস্যা না হলেও অতিরিক্ত চিনি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস শিশুর জন্য ভালো নয়।

অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার দাঁতের ক্ষয়, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি এসব খাবার বেশি খেলে অনেক সময় শিশুর পুষ্টিকর খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।

তাই বাইরে ঘুরতে গেলেও ফল, পানি, দুধ বা ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর নাশতার মতো বিকল্প রাখা যেতে পারে। শিশুকে খাবারের ব্যাপারে ভয় দেখানোর পরিবর্তে ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস তৈরি করাই বেশি কার্যকর।

মোবাইল দিয়ে খাওয়ানো—সহজ সমাধান, কিন্তু ভালো অভ্যাস নয়

অনেক বাবা-মা শিশুকে খাওয়ানোর সময় মোবাইলে কার্টুন, গেম বা ভিডিও চালিয়ে দেন। এতে শিশু দ্রুত খাবার খেয়ে নেয় ঠিকই, কিন্তু ধীরে ধীরে মোবাইল ছাড়া খেতে না চাওয়ার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।

খাবারের সময় স্ক্রিনে মনোযোগ থাকলে শিশু কখন ক্ষুধার্ত, কখন পেট ভরে গেছে—এসব স্বাভাবিক সংকেতের প্রতি কম মনোযোগ দিতে পারে। পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, খাবারের স্বাদ ও পরিবেশ উপভোগ করাও কমে যায়।

তাই সম্ভব হলে খাবারের সময় মোবাইল ও টিভি দূরে রেখে পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা ভালো।

রিলস ও শর্ট ভিডিও: বয়স অনুযায়ী সীমা জরুরি

TikTok, Instagram Reels, YouTube Shorts-এর মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিডিও শিশুদের কাছে খুব আকর্ষণীয়। কিন্তু অল্প বয়সে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা এবং মনোযোগ ও আচরণগত সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে এটাও মনে রাখা জরুরি—শুধু রিলস দেখলেই কোনো শিশু ‘অস্থির’ বা ‘হাইপারঅ্যাকটিভ’ হয়ে যাবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। শিশুর বয়স, ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক পরিবেশ, ঘুম, খেলাধুলা ও মোট স্ক্রিন ব্যবহারের সময়—সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।

বিশেষ করে ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার না করানো, শিশুর বয়স অনুযায়ী স্ক্রিনের সীমা নির্ধারণ করা এবং বাবা-মায়ের নিজেরাও স্ক্রিন ব্যবহারে ভালো উদাহরণ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো বিনোদন কী?

সব বিনোদনই যে ইনডোর কিডস জোন বা মোবাইলের মাধ্যমে হতে হবে—এমন নয়।

শিশুকে নিয়ে পার্কে হাঁটা, মাঠে খেলাধুলা, সাইকেল চালানো, বই পড়া, ছবি আঁকা, গল্প বলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বয়স উপযোগী সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শিশুর খেলাধুলা শুধু শরীরকে সক্রিয় রাখে না; এটি সামাজিক দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বিকাশেও সহায়তা করে।

অভিভাবকদের করণীয়

১. খাবারের সময় মোবাইল বা টিভি বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন।
২. শিশুর বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম তৈরি করুন।
৩. ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমিয়ে দিন।
৪. কিডস জোনের পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা যাচাই করুন।
৫. বাইরে থেকে ফিরে হাত ভালোভাবে ধুতে শেখান।
৬. অতিরিক্ত চিনি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে পুষ্টিকর খাবার দিন।
৭. প্রতিদিন বয়স উপযোগী শারীরিক খেলাধুলা ও সক্রিয় সময় নিশ্চিত করুন।
৮. শিশুর সঙ্গে কথা বলুন, গল্প করুন এবং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন।
৯. শিশুকে ব্যস্ত রাখার একমাত্র উপায় হিসেবে মোবাইলকে ব্যবহার করবেন না।
১০. শিশুর ঘুম, আচরণ, খাবার বা বিকাশ নিয়ে দীর্ঘদিন কোনো সমস্যা থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

কিডস জোন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব

শিশুদের বিনোদনের জায়গাগুলোতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, নিরাপদ খেলনা ও রাইড, বয়স অনুযায়ী খেলার ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

বিশেষ করে বল পিট, প্লাস্টিকের খেলনা, স্লাইড ও শিশুদের বেশি স্পর্শ করা জায়গাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার সময়সূচি দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ করলে অভিভাবকদের আস্থাও বাড়বে।

 

শিশুর হাসি আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। কিন্তু সেই হাসিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শুধু সাময়িক আনন্দ নয়, তার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও সুন্দর বিকাশের কথাও ভাবতে হবে।

শিশুকে মোবাইল দিয়ে চুপ করানো নয়—সময় দিন।
অস্বাস্থ্যকর খাবার দিয়ে খুশি করা নয়—ভালো খাবারের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
শুধু কৃত্রিম বিনোদন নয়—প্রকৃতি, খেলাধুলা ও পরিবারের সান্নিধ্য দিন।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের পৃথিবী গড়বে। তাই তাদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করা শুধু বাবা-মায়ের নয়—পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও পুরো সমাজের দায়িত্ব।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার সেই প্রত্যয়ের কথাই মনে পড়ে—

“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”

শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমাদের অঙ্গীকার হোক—
নিরাপদ শৈশব, সুস্থ জীবন এবং প্রযুক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ বেড়ে ওঠা।

 

আরিফ রহমান :- লেখক ও গবেষক : আজীবন সদস্য, নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট।