
নিজস্ব প্রতিবেদক :: বরিশালে লঞ্চ-বাসের টিকিট যেন সোনার হরিণ : তোষক বিছিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন লঞ্চ কর্মচারীরা।
লঞ্চে কেবিন নেই, ডেকে বসার জায়গা নেই, বাসে টিকিট নেই, পাওয়া যায় না বিআরটিসির বাসেরও টিকিট। এ অবস্থায় নানা বিড়ম্বনা ও ঝক্কিঝামেলা কাঁধে নিয়ে ৯ দিন ছুটি শেষে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ ছুটছে কর্মস্থলে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চের ছাদে, বাসে দাঁড়িয়ে, খোলা, ট্রাক ও মাইক্রোবাসযোগে যাচ্ছেন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আর মানুষের দুর্ভোগকে কাজে কিছু লঞ্চ-বাসের টিকিট কালো বাজারে বিক্রি করছে। এ ছাড়া লঞ্চের ডেকে বিছানা চাদর ও বালিশ তোষক বিছিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন লঞ্চ কর্মচারীরা। নৌবন্দর ও বাস টার্মিনাল এলাকাগুলোয় প্রশাসনিক কার্যক্রম থাকলেও এগুলো প্রতিরোধ হচ্ছে না।
সরেজমিনে বাস টার্মিনাল ও লঞ্চঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালে ঢাকাগামী নিয়মিত ও বিশেষ সার্ভিসের লঞ্চগুলো নোঙর করে আছে। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই লঞ্চের ডেক যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সাধরণ মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার জন্য লঞ্চের ছাদ ও কেবিনের করিডোরে বিছানা বিছিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
এদিকে এমভি পারাবাত কোম্পানির চারটিসহ এমভি মানামী, এমভি কীর্তনখোলা, এমভি কুয়াকাটা-২ লঞ্চগুলোর প্রথম তলার প্রায় অর্ধাংশ এবং দ্বিতীয় তলার পুরো এলাকা বিছানা বিছিয়ে দখল করে রাখতে দেখা গেছে। যা পরবর্তী সময়ে যাত্রীদের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করেছে।
মানামী লঞ্চের যাত্রী মো. আহসান উল্লাহ্ বলেন, দুপুরে লঞ্চঘাটে এসে দেখি লঞ্চের ডেকে সারিবদ্ধ বিছানা চাদর পাতানো। ওই লঞ্চের এক শ্রমিকের কাছ থেকে দুইজনের জন্য ছয় ফুট চওড়া জায়গা চারশ টাকায় কিনতে হয়েছে।
কীর্তনখেলা লঞ্চের যাত্রী মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, দুপুরের পরে এসে দেখি লঞ্চের ডেকে পা ফেলানোর জায়গা নেই। তাই নিরুপায় হয়ে ছাদে বিছানা বিছিয়ে জায়গা করে নিয়েছি।
পারাবত লঞ্চের যাত্রী মিন্টু সরদার বলেন, লঞ্চের প্রত্যেকটি ফ্যান এলাকার জায়গা লঞ্চ স্টাফরা চাদর বিছিয়ে দখল করে রেখেছে। তাদের কাছ থেকে তিনশ টাকা দিয়ে জায়গা কিনে নিয়েছি।
সুন্দরবন-১০ লঞ্চের যাত্রী মো. সাওখাত হোসেন বলেন, কেবিন না পেয়ে দুপুরে ঘাটে এসে দেখি লঞ্চের ডেকও প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। অতি কষ্টে লঞ্চের সিঁড়ির নিচে একটু জায়গা পেয়েছি।
পারাবত লঞ্চের বরিশালের ব্যবস্থাপক মো. সেলিম হোসেন বলেন, যাত্রীরা সকালে লঞ্চে এসে বিছানা চাদর ও তোষক বিছিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। এখানে আমাদের স্টাফদের কোনো হাত নেই। তার পরে এ কাজের সঙ্গে কেউ যুক্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।
সুন্দরবন লঞ্চের বরিশালের কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর লঞ্চের তেমন একটা যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। ঈদের পর থেকে যাত্রীদের তেমন একটা চাপ নেই। তবে গতকাল শুক্রবার (৪ এপ্রিল) ও আজ শনিবার যাত্রীদের চাপ বেশি। এই দুই দিনের কেবিনের টিকিট আগাম বিক্রি হয়ে গেছে।
বরিশালের যাত্রীবাহী লঞ্চ মালিক সমিতির সদস্য সাইফুর ইসলাম পিন্টু বলেন, ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে লঞ্চযাত্রী তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আগামীকাল রবিবার সরকারি ও বেশির ভাগ বেসরকারি অফিস খুলবে। ফলে দীর্ঘ ৯ দিনের ঈদের ছুটি শেষে শুক্র ও শনিবার সব পরিবহন সেক্টরে চাপ অনেক বেশি।
বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সব প্রকার প্রস্তুতি নিয়েছি। যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বিাইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ, নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, মেট্রোপলিটন পুলিশ, আইন-শৃঙ্খলা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতও কাজ করছেন। গতকাল টিভি লঞ্চ বরিশাল ঘাট ত্যাগ করেছে।
এই চাপ শনিবার আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে বিশেষ সার্ভিসের লঞ্চ বাড়ানো হবে। যাত্রীদের কাছে ডেকের জায়গা বিক্রি করা হচ্ছে এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছে।
অন্যদিকে বরিশালের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের অবস্থাও একই। বরিশাল বিভাগের জেলা শহর ও জেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি বাস রাজধানী শহর ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছেড়ে যায়। বাসের সোনার হরিণ নামক টিকিট সংগ্রহ করতে যাত্রীদের গলদঘর্ম হয়। সকাল হতে না হতেই কাউন্টারের সব টিকিট শেষ হয়ে যায়।
বাসযাত্রী মো. শাজাহান মিয়া বলেন, স্বরূপকাঠী কাউন্টারগুলোতে টিকিট না পেয়ে সকাল ৬টায় বরিশালের বাস টার্মিনালে এসে টিকিট কাটার চেষ্টা করেছি। শনিবারের টিকিট কাউন্টারের না পেলেও দালালদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
সব্বির হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, রবিবার অফিস খোলা। তাই আজ শুক্রবার পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার জন্য হানিফ পরিবহনের কাউন্টারের এসে ছিলাম। কিন্তু সেখানে টিকিট পাইনি। তবে কালোবাজার থেকে চারটি টিকিট সংগ্রহ করেছি।
টিকিটপ্রতি দুইশ টাকা বেশি নেওয়া হলেও গায়ে ঠিকই ৫৩৪ টাকা লেখা রয়েছে।
বরিশালের বাস মালিক গ্রুপের সদস্য (মালিক সমিতি) মোশাররফ হোসেন, বেশিরভাগ পরিবহনের অনলাইন টিকিট বুককিপিং ব্যবস্থা থাকায় আগামী ১২ মার্চ পযর্ন্ত প্রায় সব বাসের টিকিট অগ্রিম বুককিপিং দেওয়া হয়েছে। ফলে বাস কারেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে বেশিরভাগ বাসযাত্রী শূন্য ফিরছে। ফলে তারা বাসে দাঁড়িয়ে, খোলা ট্রাক, কার্ভাডভ্যান ও মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনযোগে গন্তব্যে ছুটছেন।
তিনি আরও বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তৎপর রয়েছে। পাশাপাশি টিকিট কালোবাজারিদের ধরতে মালিক সমিতির সদস্যরাও কাজ করেছে।
এদিকে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করায় করিম গ্রুপের গোল্ডেন লাইন পরিবহনের টিকিট কাউন্টারকে পাঁচ হাজার টাকা এবং একই অপরাধে লাবিবা ক্লাসিক পরিবহনের কাউন্টারকে পাঁচ হাজার টাকা, হানিফ পরিবহনের টিকিট কাউন্টারকে তিন হাজার টাকা করে জরিমানা করেছে জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত।