ঢাকারবিবার , ৩১ আগস্ট ২০২৫
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্বজনদের কাছেও নিরাপদ নয় নিজ প্রাণ!

ক্রাইম টাইমস রিপোর্ট
আগস্ট ৩১, ২০২৫ ৮:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সংবাদটি শেয়ার করুন....

হাফিজ স্বাধীন :: আহ্! এও কি জীবন। মানছে না রক্তের বাঁধন। সবই যেনো ফিকে হয়ে যাচ্ছে স্বার্থের বেড়াজালে। ফলে আপনজনের প্রাণ কেড়ে নিতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না। হয়তো বা স্বামী-স্ত্রী কিন বা ভাই এমনকি জন্মদাতা পিতা-মাতাও। রক্তের বাঁধন অথবা সম্পর্ক চিরতরে বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছে একের পর এক হত্যাযজ্ঞ। এখন পর্যন্ত পাঁচ ব্যক্তির প্রাণবিয়োগের ঘটনার মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চল অর্থাৎ বরিশাল বিভাগের গ্রাম থেকে শহরে সৃষ্টি হয়েছে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনী যেনো ঠুনকো জগন্নাথ, রোধ করতে পারছে না সার্বিক পরিস্থিতি। ফলে এই জনপদ এখন এক রক্তগঙ্গায় পরিণত হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। তার থেকেও বড় কথা এখন মানুষ খাওয়া-পড়ার চেয়েও নিজের প্রাণ রক্ষা করাই যেনো দুরহ হয়ে পড়েছে নানান ঘটনা প্রবাহে। এসব হত্যাকাণ্ডের পিছনে পারিবারিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিহিত থাকলেও কোন কোন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহারে প্রতিয়মান হচ্ছে।
অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসলেও আবার অনেক ঘটনা আলোচনায় আসছে না। পত্র-পত্রিকায় উঠে আসা ঘটনার ধারাবাহিকতার সংখ্যাগত দিক পর্যালোচনা করলে সাম্প্রতি অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ড যেমন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, তদ্রুপ ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে অপরাপর স্বজন বা পড়সিদের মধ্যে। বিশেষ করে পাঁচটি ঘটনা গোটা বরিশালে তোলপাড় সৃষ্টি করে এবং রাজনীতি ব্যক্তিবর্গ ও সুশিল সমাজে নানা প্রতিক্রিয়ায় বাস্তবতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা উঠে আসে।
এরমধ্যে আগস্ট মাস শুরুর আগের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বরিশালের একটি ঘটনা বেশিমাত্রিক আলোচনায় আসে। নগরীর পশ্চিম জনপদ কাউনিয়ার ত্রাস বাগান বাড়ির ছোট মিল্টন দল-বল নিয়ে নিজ বন্ধু লিটুকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। উভয়ই জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। লিটনের বাড়ি অর্ধ কিলোমিটার দূরত্ব বিল্ববাড়ি গ্রামে হলেও সন্ধ্যার পূর্বে সেখানে মিল্টন উপস্থিত হয়ে এমন নির্মমতা চালায় যে, পরিকল্পিত হামলায় নিজ বন্ধু ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়।
এঘটনার পিছনে রয়েছে নিহত লিটুর আপন বোন জামাতার ইন্ধন। জামাতা জাকির গাজী দ্বিতীয় বিয়ে করায় প্রথমা স্ত্রী মুন্নি আক্তার ও ভাই লিটু মিলে প্রতিবাদ করায় প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে সেই আপন দুলাভাই শ্যালককে হত্যার পরিকল্পনা আটে এবং এতে ব্যবহার করে মিল্টন বাহিনীকে। এরপরই (৩১ জুলাই) সন্ধ্যায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় লিটন সিকদার লিটুকে। এ ঘটনা রাজনৈতিকভাবে দেখা হলেও এর পেছনে পারিবাকি দ্বন্দ্ব-সংঘাত রয়েছে তা ঢাকা পরে যায় আলোচনার টেবিলে।
ঘটনার পেক্ষাপটে রিয়াজ মাহমুদ খান ওরফে মিল্টনকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। তিনি মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন। পক্ষান্তরে নিহত লিটন সিকদার লিটুও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ছিলেন কিন্তু তিনিও সাম্প্রতিক সংগঠন থেকে বহিস্কার হয়েছিলেন। এলাকায় চাউর রয়েছে মিল্টন ও লিটু উভয়ই মাদক সিডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সবার চোখ ফিরে যায় পটুয়াখালী জেলার ঘটনা প্রবাহের দিকে। জেলার বাউফল উপজেলার একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করলেই বোঝা যায় রক্তের বাঁধন ছিন্নে কতটা সহজ হয়ে উঠেছে বা নিমর্মতা ঠেকেছে কোন কীনারে। গত ২৭ আগস্ট প্রকাশিত তথ্য মধ্যে বাউফল উপজেলায় আপন বাবা-মা ও ভগ্নিপতি একত্রিত হয়ে নিজ মেয়েকে হত্যা করে পাশ্ববর্তী খালে ফেলে দেয়ায়। ১৪ বছর বয়সি উর্মির অপরাধ এক যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাকে শাসনের পরও স্থানীয় ওই যুবকের ভালোবাসার টানে নিজের অবস্থান অনঢ় থাকায় গত (২০ আগস্ট) গভীর রাতে শ্বাসরোধে হত্যা করে কিশোরী উর্মিকে। পুলিশ তার লাশ উদ্ধারের ছয় দিন পর নেপথ্যের কাহিনী  উন্মোচিত হয়। গ্রেফতারকৃত বাবা-মা ও ভগ্নিপতি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে বিবৃতিও দেয়।
এরপরের আরেকটি ঘটনা আরও মর্মান্তিক নয় কি? একই উপজেলায় গত (৩১ জুলাই) বৃহস্পতিবার পরন্ত বিকেলে স্ত্রী সালমা আক্তার মাদ্রাসাশিক্ষিকাকে নিজগৃহে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় স্বামী। অবশ্য পরে ঘাতক স্বামী সরোয়ার তাদের চার বছর বয়সি শিশুসন্তানকে নিয়ে গভীর রাতে থানায় উপস্থিত হয়ে নিজের অপরাধরোধ স্বীকার করে স্ত্রী পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়ার সন্দেহ থেকে এই হত্যাকাণ্ড করে বলে জানান দিয়ে অনুতপ্ত হন। স্বল্প দিনের ব্যবধানে এই দুটি ঘটনা বাউফলবাসী হতবুদ্ধি হয়ে পরে। সেই সাথে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
গত ২০ আগস্ট আরও একটি ঘটনা এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে দাগ কাটে। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় মেয়ে জামাই নিজ শ্বশুরকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সামান্য কিছু টাকার জন্য। দুগ্ধ ব্যবসায়ী অখিল হালদার মন্টু নিজ জামাতা কৃষ্ণ বাড়ৈকে ৩০ হাজার টাকা লোন দিয়ে সময়সাপেক্ষে ফেরৎ চাওয়া নিয়ে বাকবিতাণ্ডার এক পর্যায়ে জামাইকে চপেট আঘাত করায় শুরু হয় ঘটনার সূত্রপাত। প্রতিশোধ পরায়ণ কৃষ্ণ বাড়ৈ (২০ আগস্ট) শ্বশুরকে প্রথমে অপহরণ করে নিকট দুরত্বের এক নির্জন যায়গায় আটকে রেখে নির্যাতন পরবর্তী হত্যা করে লাশ খালের কচুরিপনায়র নিচে লুকিয়ে রাখে।
এরপর ওই দুগ্ধ ব্যবসায়ীর স্ত্রী বিউটি হালদার স্বামীর খোঁজ না পেয়ে (২১ আগস্ট) স্থানীয় থানায় একটি জিডি দায়ের করেন। অন্যদিকে জামাতা কৃষ্ণ বাড়ৈ কিছুটা আত্মগোপনের ন্যায় চলা ফেরা করলেও বিষয়টি কেউ আচ করতে পারেনি যে জামাতা নিজ শ্বশুরকে অপহরণের পর হত্যা করার মত নিমর্মতার পথ বেছে নিতে পারে। পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শ্বশুর-জামাতার লোকেশনের সূত্রপাত ধরে কৃষ্ণ বাড়ৈকে আটক করলে বেড়িয়ে আসে মন্টু হত্যার আদ্যপান্ত।
তবে সবচেয়ে বেশি স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া শিরোনাম ছিল বরিশাল জেলার মুলাদীর চরে চোখ উৎপাটনের একটি ঘটনা। যা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার চেয়ে বেশি মর্মদায়ক বলে বিবেচিত হচ্ছে। কেউ বলছে, মধ্যযুগীয় ঘটনাকেও হাড় মানায় উপজেলার বাহেরচর গ্রামের এই ঘটনা। ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, ঢাকায় কর্মরত রিপন গত (২০ আগস্ট) শুক্রবার বাড়ি ফিরে ভাইয়ের কাছে রক্ষিত অর্থ ও ২০ ভরি স্বণাংলকার বিশেষ প্রয়োজনে ফেরত চায়। কিন্তু তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রিপন পেট্রোল দিয়ে বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এরপর বাবা আর্শেদ বেপারীর নির্দেশে তার দুই পুত্র রোকন বেপারী ও স্বপন বেপারী একাতিত্ব হয়ে নিজ ভাইকে বাড়ির উঠনে ফেলে দুই চোখ উবরে ফেলে।
এই ঘটনার বিশেষ একটি দিক হল, এর মধ্যযুগীয় ঘটনার সময় আহত রিপন বাঁচার স্বার্থে ডাক-চিৎকার দিলেও এলাকাবাসী কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকি আপন স্বজনদের মনও গলেনি। পরে অবশ্য পুলিশ অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রধান অভিযুক্ত স্বপন বেপারীকে গ্রেফতার করলেও পিতা ও অপর ভাই এখনও পলাতক রয়েছে বলে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে। উল্লেখিত ঘটনা প্রবাহে প্রমাণ করে গোটা বরিশাল বিভাগে পুলিশ প্রশাসনের দুর্বলতার কারণেই অপরাধ প্রবণতা দিন পর দিন বেড়েই চলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গরা বলছে, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর পুলিশের নিলপ্তায় যেমন বাড়ছে মাদক বেচাকিনা তেমনিই সামাজিক অবক্ষয় শূন্যের কোঠায় দিয়ে দাঁড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে মাদক বিস্তারকে বেশি দায় করা হচ্ছে।
অল্প দিনেই বিস্তার টাকা আয়ের সুবর্ণ সুযোগ পাওয়ায় মানবতার যায়গায় হিংসতার জন্ম হচ্ছে। যেমন মিল্টন-লিটুর ঘটনা উৎকৃষ্ঠ উদাহরণ হতে পারে। জনশ্রুতি রয়েছে, এই পথে অল্প দিনে অর্থশীল হওয়ার কারণে মাদকের পথ বেছে নিচ্ছে কারবারিরা। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অপরাধ বিস্তারের ঘটনা দেখে নিরব দর্শকের ভূমিকায় থাকছে বা বাধ্য হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মুখে।

রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহারে উল্টো ফলও দেখা যায় পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ার উপজেলায়। এই জনপদের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। একজন নারিকেল চোর তার চৌয়শা ধরা পরায় শালিস বিচারে স্থানীয় বিএনপি নেতা রেজাউল কবির ঝন্টু ভূমিকা রাখায় তার খেসারত হিসেবে প্রাণ দিতে হয়। এ ঘটনা গত (২৯ আগস্ট) শুক্রবার সকাল বেলা প্রকাশ্য দিবালোকেই ঘটে। ফলে আইনশৃঙ্খলার এই অবনতির প্রেক্ষাপটে মানবেতাও ভুলণ্ঠিত হয়ে গেছে। যেখানে মানবতা নেই সেখানে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকে কোথায়? এ কারণেই তো মানুষের জীবন এখন স্বজনদের কাছেও নিরাপদ নয়।